নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধ অষ্টম দিনে আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শনিবার ভোরে আবারো ব্যাপক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তেলআবিবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিভিন্ন স্থানে দাউ দাউ করে আগুন জ¦লতে দেখা গেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এক ভিডিও বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপের মুখে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি একটি অবাস্তব স্বপ্ন, যা তারা ‘নিজেদেরকে কবর পর্যন্ত নিয়ে যাবে।’ একই সাথে তিনি ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানান।
আলজাজিরার সরাসরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে ইসরাইলি হামলার পর তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল কারচাক এলাকায় বিপ্লবী গার্ডের একটি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তাদের সব সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশ- সব ক্ষেত্রেই কঠোর পাল্টা হামলা চালানো হবে বলে সতর্ক করেছে তারা।
এ দিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা তেহরান ও ইসফাহানে নতুন করে হামলার ঢেউ শুরু করেছে। একই সাথে লেবাননের বেকা উপত্যকার নবী চিত শহরে রাতভর ইসরাইলি হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছে বলে লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
সঙ্ঘাতের বিস্তার এখন মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু ছিল। যদিও এ দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অন্য দিকে কাতার ও বাহরাইন তাদের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। বাহরাইনের সামরিক বাহিনীর দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা অন্তত ৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৪৮টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বাহরাইন ও ইরাকের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে ইরানে তথ্যপ্রবাহও কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, টানা সাত দিনের বেশি সময় ধরে দেশটির বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ নেই। ইরানি সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা বলছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও হামলার পরিসর বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্ঘাত আরো বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এ দিকে ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে ইরানি কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো, যা যুদ্ধকে আরো বহুমাত্রিক করে তুলতে পারে। তবে যেকোনো স্থল হামলার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার কথা বলেছে আইআরজিসি।
আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি কুর্দিস্তানের সংগঠন ‘খাবাত অর্গানাইজেশনে’র মহাসচিব বাবাশেখ হোসেইনি বলেছেন, ইরাকভিত্তিক কুর্দি যোদ্ধারা ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান শুরু করতে পারে। তিনি বলেন, এখনো কোনো আক্রমণ শুরু হয়নি, তবে ‘পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ায় অভিযান চালানোর শক্ত সম্ভাবনা রয়েছে।’
হোসেইনি আরো দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের সাথে যোগাযোগ করেছে। যদিও এখনো সরাসরি বৈঠক হয়নি, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো স্থল অভিযানে যেতে হলে আধুনিক অস্ত্র ও উন্নত সরঞ্জামের প্রয়োজন হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ও দিকে যুদ্ধের সামুদ্রিক মাত্রাও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ইরানের আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে মাল্টা পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাঙ্কার ‘প্রিমা’কে ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানের দাবি, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে জাহাজটি নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করায় এই হামলা চালানো হয়।
লেবাননেও সঙ্ঘাতের বিস্তার ঘটেছে। গত এক সপ্তাহে লেবাননে দুই শতাধিক মানুষ নিহত এবং প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতির অবনতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে এমিরেটস এয়ারলাইন। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে আর লক্ষ্যবস্তু করা হবে না- যদি সেসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা না চালানো হয়। সাম্প্রতিক হামলার জন্য তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশও করেছেন।
ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধ : বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন কেবল ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ, সমুদ্রপথ এবং আঞ্চলিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততার কারণে এটি দ্রুত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইসরাইল বিশেষভাবে আরব দেশগুলোকে এই যুদ্ধে টেনে আনতে চাইছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ইরান হামলা না করলেও রহস্যজনক ড্রোন হামলা হয়েছে একের পর এক।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন- সঙ্ঘাত কেবল ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; আঞ্চলিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী, সমুদ্রপথ, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং তেল ও গ্যাস রুটের ঝুঁকি এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে রূপ দিতে পারে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে যুদ্ধের বিস্তার এবং মানবিক সঙ্কট বৃদ্ধি পেতে পারে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসঙ্ঘের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষভাবে জেরুসালেমের জনসংখ্যাগত ও ধর্মীয় চরিত্রের পরিবর্তন, বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার প্রভাব নিয়ে সতর্কতার দাবি উঠেছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দেশজুড়ে ৬,৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫,৫৩৫টি আবাসিক ভবন; ১,০৪১টি বাণিজ্যিক স্থাপনা; ১৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র; ৬৫টি স্কুল; রেড ক্রিসেন্টের ১৩টি স্থাপনা।
মার্কিন সামরিক অভিযান প্রথম ১০০ ঘণ্টায় প্রায় ৫.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় খরচ হয়েছে প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার।
আমিরাতে আমেরিকান লক্ষ্যবস্তুতে হামলা : ইরান দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও ফায়ার-কন্ট্রোল রাডার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই হামলার বিষয়টি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইরানের নৌবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি আমিরাত সরকার। হামলার কারণে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। পরে আংশিকভাবে ফ্লাইট চালু হয়। সামাজিক মাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, বিমানবন্দর এলাকা কেঁপে উঠেছে এবং আকাশে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী।
লেবাননে হামলা ও প্রতিরোধ : হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, ইসরাইলি কমান্ডোরা বেকা উপত্যকায় একটি হেলিকপ্টারভিত্তিক অভিযান চালানোর চেষ্টা করলে তাদের যোদ্ধারা তা প্রতিহত করে। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ১৯৮৬ সালে লেবাননে নিখোঁজ হওয়া ইসরাইলি বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা রন আরাদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলায় জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিলে কর্মরত ঘানার কয়েকজন সেনা আহত হয়েছেন। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বিন্ত জবেইল জেলার কৌজাহ এলাকায় ইউনিফিলের একটি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে নতুন ব্যবস্থা : কাতারে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে সহায়তার জন্য নতুন বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। নাগরিকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি ইমেইল পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগার, ওমানের দুকম বন্দর, কাতারের গ্যাস প্ল্যান্ট হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিদেশী কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
সামরিক সহযোগিতা নিয়ে সৌদি-কুয়েত আলোচনা : সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান শুক্রবার সন্ধ্যায় কুয়েতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদুল্লাহ আলি আবদুল্লাহ আল সালেম আল সাবাহর সাথে ফোনে কথা বলেছেন। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, আলোচনায় দুই দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ দিকে এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর আকাশসীমা আংশিক খুলে দেয়ায় কাতার এয়ারওয়েজ সীমিত ফ্লাইট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। শিগগিরই লন্ডন, প্যারিস, রোম, মাদ্রিদ ও ফ্রাঙ্কফুর্টগামী ফ্লাইট চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা : ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বলেছে, রাতভর অভিযানে ৮০টির বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নিয়ে প্রায় ২৩০টি বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আইআরজিসির একটি সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ অবকাঠামো এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার। তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগুন লাগার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরাইলে আশ্রয়কেন্দ্রে লাখো মানুষ : ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে রাতভর ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে সাইরেন বাজে। এতে লাখো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
তেলআবিবের অনেক স্থাপনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আগুন জ¦লতে দেখা যায়। ইসরাইলি বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে বাধ্য করে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনী সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অভিযান ও গ্রেফতার কার্যক্রম জোরদার করেছে। একই সময়ে গাজা, লেবানন ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরো বাড়ছে।
রুবিও : ইরান যুদ্ধ আরো কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে ফোনালাপে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধ ‘আরো কয়েক সপ্তাহ’ চলতে পারে।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, মজুদ ও উৎপাদন কারখানাগুলোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ‘শাসন পরিবর্তন’ নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যুদ্ধাপরাধ তদন্তের আহ্বান : মার্কিনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ডেমোক্র্যাসি ফর দ্য আরব ওয়ার্ল্ড নাউ (উঅডঘ) ইরানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ওঈঈ)-এর বিচারিক ক্ষমতার স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাসপাতাল ও স্কুলসহ বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আকাশপথ এড়িয়ে চলছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট : নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো এখন ইরানের আকাশসীমা এড়িয়ে চলেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে দেখা গেছে, বিমানগুলো দীর্ঘ পথ ঘুরে উপসাগরীয় অঞ্চল পার হচ্ছে।
ট্রাম্পের সামরিক সাফল্য নিয়ে ধোয়াশা : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধের এক সপ্তাহ পার হয়েছে। এরই মধ্যে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক সাফল্যকে পরিষ্কার ভূরাজনৈতিক জয়ে রূপ দিতে পারবেন কি না- তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। একই সাথে তিনি বাড়তে থাকা ঝুঁকি ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েছেন।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়া এবং স্থল, জল ও আকাশপথে ইরানি বাহিনীর ওপর ব্যাপক আঘাত হানার পরও সঙ্কট দ্রুত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সঙ্ঘাতটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশিত সীমার বাইরে চলে যেতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আরো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সঙ্ঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড মনে করেন, এই যুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সামরিক অভিযানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তার ভাষায়, ‘ইরানে হামলা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অগোছালো সামরিক অভিযানে রূপ নিতে পারে। ট্রাম্প বিশ্ব অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান, সবকিছুকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর এটিই সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। তবে এখনো এই অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং এর শেষ কোথায়, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট কোনো রূপরেখা তুলে ধরতে পারেনি।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য স্পষ্ট। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য হলো- ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা ভেঙে দেয়া, ইরানি নৌবাহিনীর সামরিক সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ : এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (ম্যাগা) আন্দোলনের সমর্থকদের একটি বড় অংশ যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ধীরে ধীরে বাড়ছে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, ‘আমেরিকানরা ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।’
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং প্রাণহানির আশঙ্কা, এসব বিষয় মার্কিন ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।
‘শাসন পরিবর্তন’ প্রশ্নে দ্বিধা : এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ঘিরে। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের সরকার উৎখাতের ইঙ্গিত দিলেও পরবর্তী সময়ে সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। আবার বৃহস্পতিবার তিনি ইঙ্গিত দেন যে ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রাখতে পারে। এর একদিন পরই তিনি ইরানের কাছে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন। এই পরস্পরবিরোধী বার্তা বিশ্লেষকদের কাছে মার্কিন কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
‘ভেনিজুয়েলা মডেলে’র ভুল হিসাব : অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো ধারণা করেছিল যে ইরান অভিযানটিও চলতি বছরের শুরুর দিকে ভেনিজুয়েলায় পরিচালিত অভিযানের মতো দ্রুত ও সহজ হবে।
ভেনিজুয়েলায় মার্কিন বিশেষবাহিনী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দী করার পর দ্রুত দেশটির তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো ইরানেও দ্রুত রাজনৈতিক ফলাফল অর্জনের প্রত্যাশা করেছিল।
কিন্তু বাস্তবে ইরান অনেক বেশি সংগঠিত, সামরিকভাবে সক্ষম এবং কৌশলগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে এসেছে। খামেনি নিহত হওয়ার পরও ইরান তাদের সামরিক প্রতিরোধ বন্ধ করেনি; বরং আঞ্চলিক জোট ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করছে।
তেলবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা : বর্তমান সঙ্ঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরানের হুমকির কারণে ওই অঞ্চলে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ ইতিমধ্যেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ রয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক জোশ লিপস্কি বলেন, ‘এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সম্ভবত পুরোপুরি হিসাব করা হয়নি।’
আঞ্চলিক ক্ষোভ ও মিত্রদের সংশয় : উপসাগরীয় আরব দেশগুলো যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলালেও সবাই ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপে সন্তুষ্ট নয়। অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, এই সঙ্ঘাত পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আল হাবতুর এক খোলা চিঠিতে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন : আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
এ দিকে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস রয়টার্সকে বলেন, ‘সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অভিযান অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক দিক থেকে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে পর্যাপ্ত ভাবনা হয়েছে বলে মনে হয় না।’
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ : সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই সঙ্ঘাত এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামরিক সাফল্যের পরও রাজনৈতিক সমাধান স্পষ্ট নয়। ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ, আঞ্চলিক জোটগুলোর সক্রিয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ- সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেয়া হয়, তবে এই যুদ্ধ কেবল ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরো বড় আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে রূপ নিতে পারে।


