হোসেনপুরে বিলুপ্তির পথে মাকাল ফল নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা

Printed Edition
হোসেনপুরে বিলুপ্তির পথে মাকাল ফল নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা
হোসেনপুরে বিলুপ্তির পথে মাকাল ফল নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা

জাহাঙ্গীর আলম হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে একসময়ের জনপ্রিয় ঔষধি লতাজাতীয় ফল মাকাল আজ বিলুপ্তির পথে। স্থানীয়ভাবে ‘মাকাল’ নামে পরিচিত এই ফলের কথা পাঠ্যপুস্তকে থাকলেও নতুন প্রজন্মের কাছে এটি এখন অচেনা। টকটকা লাল মাকাল দেখতে আপেলের মতো হলেও ভেতরে কালো ও তিতা। একসময় কৃষকরা এর বিষ ব্যবহার করে ফসল রক্ষা করতেন। স্থানীয় ভাষায় অনেকেই এটিকে ‘কাওয়াকাডি’ বলেও ডাকে।

মাকালের আদি নাম ‘মহাকাল’, যা ধীরে ধীরে ‘মাকাল’ নামে পরিচিত হয়ে গেছে। এটি একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় উদ্ভিদ। জঙ্গলের বড় গাছ বা বাড়ির বড় গাছের সাথে লেপ্টে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। পূর্ণবয়সী মাকাল গাছ ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতার কক্ষে ফুটে সাদা রঙের ফুল, যা বর্ষাকালে ফল ধরতে সাহায্য করে। কাঁচা অবস্থায় ফল গাঢ় সবুজ, কিছু দিন পর হলুদ, আর পাকলে লাল বর্ণ ধারণ করে।

স্থানীয় বৃক্ষপ্রেমী নবী হোসেন জানান, মাকাল গাছ ও ফলের ভেষজ গুণ অনেক। শিকড় কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কফ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে, নাক-কান ক্ষত উপশমে, জন্ডিস নিরাময়ে, দেহে পানি জমে গেলে দূর করতে এবং শিশুদের অ্যাজমা নিরাময়ে মাকালের ফল, মূল ও কান্ড বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বীজের তেল সাপের কামড়, পেটের সমস্যা, মৃগীরোগ এবং সাবান উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। বীচি ও আঁশ শুকিয়ে গুঁড়ো করে পানিতে দ্রবীভূত করলে ফসলের পোকামাকড়, ইঁদুর ও রোগবালাই দমনে সহায়ক হয়। আবহমানকাল ধরে কিশোরগঞ্জের কৃষকরা মাকালের বিষ ব্যবহার করে ফসল রক্ষা করেছেন।

মাকালের গাছ প্রাকৃতিকভাবে বন-জঙ্গলে এবং পরিত্যক্ত জায়গায় জন্মায়। দেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলার জঙ্গলে এই গাছ বেশি দেখা যায়। তবে গত এক দশকে এর সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বন উজাড়, পরিবেশে কীটনাশকের প্রভাব এবং বাজারে মাকালের বিষের অনুপস্থিতি এ ফলের অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। স্থানীয় পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংরক্ষণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আগামী দশকে মাকাল ফল চিরতরে হারিয়ে যাবে।

মাকালের বৈজ্ঞানিক ও ঔষধি গুণের পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। স্থানীয় প্রশাসন, কৃষক ও বনকর্মীরা একযোগে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক বন পুনঃস্থাপন এবং মাকাল গাছ রোপণে মনোনিবেশ করলে এর বিলুপ্তি রোধ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সংরক্ষণই যথেষ্ট নয়, নতুন প্রজন্মকে মাকালের গুরুত্ব, ব্যবহার এবং পরিচয় জানানোও সমান জরুরি। প্রকৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকা এই লতাজাতীয় ফল আজ নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হলেও এর ঔষধি, কৃষি ও পরিবেশগত গুরুত্ব অপরিসীম।