তেলের চাহিদা পূরণে সাতক্ষীরায় সূর্যমুখী চাষে নতুন সম্ভাবনা

Printed Edition
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ভরশা গ্রামের সূর্যমুখীর ক্ষেত : নয়া দিগন্ত
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ভরশা গ্রামের সূর্যমুখীর ক্ষেত : নয়া দিগন্ত

জিললুর রহমান সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে লবণাক্ততা দীর্ঘ দিন ধরেই কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সেই লবণাক্ত পতিত জমিতেই এখন হলুদ রঙের নতুন স্বপ্ন দেখছেন কৃষকেরা। শ্যামনগর উপজেলার উপকূলঘেঁষা এলাকা ও তালার নিম্নাঞ্চলে সূর্যমুখী ফুলের চাষে সাফল্য আসায় জেলায় ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কম খরচ, স্বল্পসময় এবং সরকারি প্রণোদনা; এই তিন কারণে সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে সাতটি উপজেলায় মোট ২২৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। গত বছর এ আবাদ ছিল ১০৯ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ১১৯ হেক্টর। এর মধ্যে তালায় ৬৩ হেক্টর, শ্যামনগরে ৬০, কালিগঞ্জে ৩৪, সদর উপজেলায় ২৭, কলারোয়ায় ২২, আশাশুনিতে ১৫ এবং দেবহাটায় সাত হেক্টর জমিতে এ ফসলের চাষ হয়েছে।

তালা উপজেলার পাটকেলঘাটার কপোতাক্ষ নদপাড়ের ভারশা গ্রামের মাঠে গেলে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ হলুদ আভা। দূর থেকে মনে হয় যেন হলুদ গালিচা বিছানো। কাছে গেলে দেখা যায় সারি সারি সূর্যমুখী ফুল বাতাসে দুলছে। স্থানীয়রা বলছেন, শুধু সৌন্দর্য নয়, এই ফুল এখন আয়েরও বড় উৎস।

ভারশা গ্রামের কৃষক আকবর হোসেন জানান, সূর্যমুখী চাষের মূল লক্ষ্য তেল উৎপাদন। তার ভাষ্য, প্রতি বিঘা জমিতে সাত থেকে দশ মণ পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে অন্তত আধা লিটার তেল উৎপাদন সম্ভব। সে হিসাবে প্রতি বিঘায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল মিলতে পারে। বর্তমানে প্রতি লিটার সূর্যমুখী তেলের দাম কমপক্ষে ২৫০ টাকা। অথচ প্রতি বিঘায় খরচ হয় সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার টাকা। তেল ছাড়াও বীজের খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তিনি বলেন, লবণাক্ত জমিতে অন্য ফসল ভালো না হলেও সূর্যমুখী তুলনামূলক ভালো ফলন দিচ্ছে। স্বল্প সেচ ও কম পরিচর্যায় এ ফসল উৎপাদন সম্ভব। তাই কৃষকেরা ঝুঁকছেন এ আবাদে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, সূর্যমুখী একটি সম্ভাবনাময় তেলবীজ ফসল। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, পাশাপাশি মানসম্মত বীজ ও সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের ভোজ্যতেলের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। স্থানীয়ভাবে সূর্যমুখী উৎপাদন বাড়লে আমদানির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন বাড়াতে চলতি মৌসুমে ৬০০ কৃষককে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকে এক কেজি করে টিএসএফ জাতের বীজ এবং দুই ধরনের সার মিলিয়ে ২০ কেজি পেয়েছেন। বীজ ও সার বাবদ মোট ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকার সহায়তা দেয়া হয়েছে। এই প্রণোদনা কৃষকদের উৎসাহিত করেছে বলে জানান তিনি।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। সে প্রেক্ষাপটে বিকল্প তেলবীজ ফসল হিসেবে সূর্যমুখী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে ছোট আকারের তেল নিষ্কাশন যন্ত্র স্থাপন করা গেলে স্থানীয় বাজারে সরাসরি সরবরাহও বাড়ানো সম্ভব।

স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, সরকারিভাবে ক্রয়ব্যবস্থা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা হলে সূর্যমুখী চাষ আরো সম্প্রসারিত হবে। তেলের বাড়তি চাহিদা ও বাজারদর বিবেচনায় সাতক্ষীরার মাঠে এখন সূর্যমুখী শুধু ফুল নয়, সম্ভাবনারও প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।