নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা আলো ঝলমলে দুবাই নগরী এখন এক অচেনা জনমানবহীন জনপদে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের ওপর হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলায় এক বিপর্যস্ত শহরের নাম দুবাই। হাজার হাজার বাসিন্দা ও পর্যটক, সৈকতের পাশের বার, শপিং মল এবং হোটেলগুলো অস্বাভাবিকভাবে খালি হয়ে গেছে। বছরে শুধু পর্যটন খাত থেকে দুবাই আয় করে অন্তত ৩০ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের সেরা সেরা ধনীদের এই বিনোদন শহরে কেউই এই যুদ্ধ চায়নি। কয়েক দশক ধরে দুবাই নিজেকে বিশুদ্ধ ভোগবাদের এক অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যেখানে সারা বিশ্বের পর্যটকরা আসতেন। যুদ্ধ সেই ‘দুবাই স্বপ্ন’এর ভিত নাড়িয়ে দেয়ায় শহরটি অস্তিত্বের সঙ্কটে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাথে আমিরাতের গভীর সামরিক ও গোয়েন্দা অংশীদারিত্ব এবং বৈশ্বিক অর্থায়ন ও পশ্চিমা অবকাশ যাপনের একটি পছন্দের কেন্দ্র হিসেবে দুবাইয়ের খ্যাতির কারণে দেশটিকে আংশিকভাবে ল্যবস্তু করা হয়েছে।
দুবাইতে গত ষোল বছর ধরে বাস করছেন ব্রিটিশ নাগরিক জন ট্রুডিঙ্কার, যিনি সেখানকার একটি আমিরাতি স্কুলের প্রধান শিক। তিনি যুক্তরাজ্য থেকে আসা ১০০ জনেরও বেশি শিককে নিয়োগ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, দুবাইতে যুদ্ধ তাদের বেশির ভাগই এতটাই ‘গভীরভাবে মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত এবং মানিয়ে নিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন’ যে তারা শহর ছেড়ে চলে গেছেন এবং আর ফিরবেন না। শহরের বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে যেতে হতে পারে এমন এক শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
প্রতিদিন প্রত্যেকের ফোনেই সতর্কবার্তা আসছে, যা সম্ভাব্য পেণাস্ত্র হামলার হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করছে এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে ও জানালা থেকে দূরে থাকতে বলছে। যদিও ইরানের ছোড়া ১,৭০০টি পেণাস্ত্রের ৯০ শতাংশেরও বেশি আমিরাতের প্রতিরা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে, কিন্তু কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি, শিল্প এলাকা এবং দুবাই বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ ল্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার ফলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই বিমান চলাচল কেন্দ্রটি অচল হয়ে পড়ে। দু’টি ডেটাসেন্টারে হামলায় দুবাইয়ের বাসিন্দারা কিছু সময়ের জন্য ডিজিটাল লেনদেনের জন্য তাদের ফোন ব্যবহার করতে পারেননি।
দুবাইয়ের বিখ্যাত কৃত্রিম পামগাছের আকৃতির দ্বীপে অবস্থিত ফেয়ারমন্ট হোটেলটিও মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে। এই দ্বীপে রয়েছে বিশাল অট্টালিকা, বিলাসবহুল হোটেল এবং অভিজাত বিচ কাব। পাকিস্তানের ট্যাক্সি চালক জাইন আনোয়ার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় তার গাড়িটি পার্ক করে রেখেছিলেন। ফেয়ারমন্টে হামলার পর তিনি দেখেন যে সেটি ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপরও তিনি বলেন, বেঁচে থাকতে পেরে আমি বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যবান ব্যক্তি। আমার পরিবার বাড়ি ফিরে আসতে বলছে। আমি আর দুবাইতে থাকতে চাই না, কোনো ব্যবসা নেই, এই যুদ্ধের পর কিছুই আয় করছি না এবং পর্যটন যে আবার ফিরে আসবে তারো কোনো লণ দেখছি না। আমার মতো অনেক ট্যাক্সি ড্রাইভার এখন অন্য কোনো দেশে চলে যাওয়ার কথা ভাবছে। সবাই জানে যে দুবাই শেষ হয়ে গেছে। শহরটির ৯০ শতাংশেরও বেশি বাসিন্দা বিদেশী, যাদের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যক বিলিয়নিয়ারও রয়েছেন, যারা আয়কর, মূলধনী লাভ এবং উত্তরাধিকারের ওপর কর না থাকার সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন।
দুবাইয়ের নির্ভর করার মতো বিশাল তেলসম্পদ নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং পর্যটনের আশ্রয়স্থল হিসেবে শহরটির সুনাম ও ব্যবসা, ব্যাংকিং এবং রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগে পশ্চিমা আস্থা ক্রমাগত য় হতে থাকে, তাহলে আর্থিক তি হবে ভয়াবহ। ইতোমধ্যে সিটিব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ‘বর্ধিত নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে’ তাদের দুবাইয়ের কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু গালফ পলিটিক্সে’র সহলেখক খালেদ আলমেজাইনি বলেন, ইতোমধ্যেই দুবাই উল্লেখযোগ্যভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে। দুবাই শাসনকারী শেখরা পরিস্থিতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক আতঙ্কিত পোস্টের পর, দুবাইয়ের পুলিশবাহিনী এমন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফুয়েন্সারদের গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ করার হুমকি দিয়েছে, যারা এমন বিষয়বস্তু শেয়ার করেছেন যা ‘সরকারি ঘোষণার বিরোধী বা যা সামাজিক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে’। কর্মকর্তাদের উচ্ছ্বসিত বার্তা জনগণকে আশ্বস্ত করছে যে আকাশে শোনা ‘বড় বিস্ফোরণের শব্দ’ হলো ‘নিরাপত্তার ধ্বনি’।
শহরে রয়ে যাওয়া বাসিন্দা ও পর্যটকেরা বলছেন যে, সৈকতের বার, শপিং মল এবং পাঁচতারা হোটেলগুলো অস্বাভাবিকভাবে খালি। সান-লাউঞ্জারে বসে ককটেল পান করতে করতে ২৬ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা হ্যালিস বলেন, আমরা ইউক্রেনের বাসিন্দা, তাই দুর্ভাগ্যবশত আমরা এক যুদ্ধত্রে থেকে আরেক যুদ্ধেেত্র এসে পড়েছি। অন্য দিকে যুদ্ধের কোনো ফুটেজ মোবাইল ফোনে ধারণ করা নিষিদ্ধ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জেল ছাড়াও ৪০ হাজার পাউন্ড গুনতে হচ্ছে।
পর্যটক ও ইনফুয়েন্সারদের গণহারে দেশত্যাগে পরো তির মধ্যে রয়েছে শত শত বিড়াল ও কুকুর, যারা দুবাইয়ের টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের বিখ্যাত তারকাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এসব প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কিংবা ল্যাম্পপোস্টের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে অথবা রাস্তায় বাক্সবন্দী করে রেখে যাওয়া হয়েছে, কারণ তাদের মালিকরা তাড়াহুড়া করে দেশ ছেড়ে চলে গেছে। দুবাইয়ের একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র এই পরিস্থিতিকে ‘জঘন্য’ বলে বর্ণনা করেছে।
যারা টাকার অভাবে দেশে ফিরতে পারছেন না সেসব শ্রম, নির্মাণ, ডেলিভারি এবং গাড়িচালক দুবাইতে আটকা পড়েছেন। যুদ্ধে আমিরাতে যে চারজন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশী পানির ট্যাঙ্কার চালক সালেহ আহমেদের পরিবার বলছে শ্রমিকদের তথ্য ও স্পষ্ট সতর্কবার্তার অভাবই তাদের মৃত্যুর কারণ। তার ছোট ভাই জাকির হোসেন (৩৫), যিনি নিজেও দুবাইতে কাজ করেন তিনি ছুটিতে দেশে ফিরেছেন। তিনি বলেন, আমি বুঝতে পারছি দুবাইতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সত্যি বলতে, দুবাইয়ের শ্রমিকরা কথা বলতে ভয় পায় পাছে কোনো বিপদে না পড়ে। বিপদ টের পেলে আমার ভাই হয়তো আরো নিরাপদ কোনো জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করত, অথবা বাড়ি ফিরে আসত। হোসেন বলেন, ভাইকে হারানোর পর দুবাইতে ফিরে যাওয়া, বিশেষ করে যখন সঙ্ঘাত চলছিল, তখন তা অসহ্য মনে হয়েছিল। কিন্তু দুবাই-ই একমাত্র জায়গা যেখানে আমরা উপার্জন করতে জানি, আমাদের পরিবারগুলো আমাদের ওপর নির্ভরশীল।



