আলজাজিরা
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের এক অনন্য সংমিশ্রণ ব্যবহার করে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিশ্লেষকরা একে ‘হিন্দুত্ব ও জনকল্যাণের ককটেল’ হিসেবে অভিহিত করছেন। উগ্র মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণা এবং নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের ওপর ভর করে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
গত ২৯ মার্চ মরিগাঁও জেলার জগিরোডে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় হাজার হাজার নারী-পুরুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে আমোইয়া মেধি নামে এক নারী জানান, বিজেপির সভায় আসা তার কাছে ধর্মীয় কর্তব্য এবং ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার বিষয়। তার মতো প্রায় ৪০ লাখ নারী সরাসরি সরকারের ‘অরুণোদয়’ প্রকল্পের সুবিধাভোগী। এই প্রকল্পের আওতায় গত ১০ মার্চ প্রত্যেক নারী ৯ হাজার টাকা করে পেয়েছেন যা রাজ্যটির ইতিহাসে এককালীন সর্বোচ্চ অর্থ বিতরণ। নির্বাচনের ঠিক আগে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ বিতরণকে বিরোধী দলগুলো ‘ভোট কেনা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী আসামের তিন কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৩৪ শতাংশই মুসলিম। এর মধ্যে প্রায় ৯০ লাখ মুসলিম বাংলাভাষী যাদের বিজেপি এবং বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বিদেশী’ বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি মিঞা মুসলিমদের আসাম দখল করতে দেবেন না। এমনকি মুসলিমদের উচ্ছেদ করার জন্য রাজ্যজুড়ে ২০ হাজার হেক্টর সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে যা মূলত বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়েছে। হিউম্যানিটেরিয়ান নিউজ আউটলেটের এক তদন্তে দেখা গেছে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে যাদের বেশিরভাগই মুসলিম।
নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপি মুসলিমদের লক্ষ্য করে ‘লাভ জিহাদ’ এবং ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ বাস্তবায়নের মতো বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্য দিকে হিন্দু ভোটারদের আশ্বস্ত করতে তারা ‘হিন্দু পরিচয় রক্ষার’ দাবি তুলছে। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অখিল রঞ্জন দত্তের মতে বিজেপি আসামের আদিবাসী সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে হিন্দুত্বের সাথে মিশিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক মডেল তৈরি করেছে। তবে আসাম বিজেপির মুখপাত্র কিশোর উপাধ্যায় এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন যে উচ্ছেদ অভিযান কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয় বরং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে। বিজেপির এই কট্টর অবস্থানের কারণে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন বাংলাভাষী মুসলিমরা। ১৯৮৩ সালের নেলী হত্যাকাণ্ডে নিজের এক বছর বয়সী বোনকে হারানো আমির আলী জানান, তিনি বিজেপির মিছিলে যান কেবল নিজেকে ‘ভারতীয়’ প্রমাণ করার জন্য যাতে তাকে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ বলে উচ্ছেদ করা না হয়। ঘরবাড়ি হারানো মেহেরবানু নেসা আক্ষেপ করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে আমাদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন তার চেয়ে আমাদের একবারে মেরে ফেলাই ভালো।



