নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বাধীনতার পর ছোট পরিসরের বাজেট দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে কয়েক শ’ গুণ। অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির বিস্তার ঘটেছে দৃশ্যমানভাবে। তবে বাজেটের আকার বড় হলেও অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা দিন দিন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বিস্তার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগে মন্থরতা অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সেন্ট্রাল ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজ অ্যান্ড থট (সিএএসটি) কর্তৃক আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। প্রফেসর মো: আব্দুর রবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান।
এ সময় বক্তারা বলেন, গত দেড় দশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির নানা সরকারি দাবি থাকলেও বাস্তবে অর্থনীতির অনেক মৌলিক সূচক দুর্বল হয়ে পড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোর মানের অবনতি হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমেছে এবং রফতানি প্রবৃদ্ধিতেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপজ্জনকভাবে কমে আসা, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং আর্থিক খাতে আস্থাহীনতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ স্থবিরতা, শিল্পখাতের মন্থর গতি এবং কড়াকড়ি মুদ্রানীতির কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ বেড়েছে। তবে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর হলে আগামী কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে পারে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আবার ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ শতাংশের ঘরে ফিরতে পারে। তারা বলছেন, শুধু বাজেটের পরিমাণ বাড়ালেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না; প্রয়োজন রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত, প্রশাসনিক কাঠামো ও সুশাসনে গভীর সংস্কার; অন্যথায় বড় বাজেটও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেটের আকার ছিল প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা। পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে এখন দেশের বাজেট দাঁড়িয়েছে প্রায় আট লাখ কোটি টাকার ঘরে। আগামী অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার হতে পারে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা। বাজেটের এই বিস্তার দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির প্রতিফলন হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি, দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাবে বাংলাদেশ একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে অর্থনীতিতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থপাচার ও অনিয়ম ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট এখন আর সাময়িক বা চক্রাকার নয়; এটি গভীরভাবে কাঠামোগত।
এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন, রাজস্ব খাত নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আহরণে ল্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের হার এখনো অত্যন্ত কম। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকায় করের আওতা বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে একই শ্রেণীর করদাতার ওপর বারবার করের চাপ বাড়ছে।
তিনি বলেন, সরকারের উচিত বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ করা। এ জন্য অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধি, ই-ফাইলিং ও ই-ভ্যাট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, তথ্যভাণ্ডার সমন্বয় এবং কর প্রশাসনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, ভীতিনির্ভর করব্যবস্থার পরিবর্তে আস্থাভিত্তিক কর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
প্রফেসর আব্দুল হামিদ বলেন, ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছানোর পর ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। তবে এই হ্রাসের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের শিথিল ঋণ পুনঃতফসিল নীতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ থাকায় প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি আড়াল হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নি এমপি বলেন, একই সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ব্যাংকের অনেকগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও সঙ্কট গভীর হয়েছে। অন্তত ১১টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে।
ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ এমপি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও ব্যয় বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা সরকারের পুনরাবৃত্ত ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি। নতুন সামাজিক সুরা কর্মসূচি যুক্ত হলে এই ব্যয় আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই এডিপির আকার বাস্তব সমতার তুলনায় বেশি ধরা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড় বাস্তবায়ন হার ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এতে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, সময়পেণ ও সম্পদের অপচয় বাড়ছে।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম মাক্কী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু উচ্চ সুদের হারনির্ভর কড়াকড়ি মুদ্রানীতি কার্যকর হবে না। এতে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে; বরং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ, দুর্নীতি দমন এবং লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
সাবেক সচিব শরীফ আলম জিন্নাহ বলেন, শুধু উচ্চ কর আরোপ বা বড় বাজেট দিয়ে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক করব্যবস্থা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং সবার জন্য সমান অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা। তাহলেই বর্তমান সঙ্কট কাটিয়ে বাংলাদেশ আরো শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির পথে এগোতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।



