নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় পুলিশ বাহিনীর দু’টি চেকপোস্টে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছেন রয়টার্স। চিকিৎসকদের মতে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনুসে দু’টি পুলিশ চেকপোস্ট লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইলি বিমান। এতে তিনজন পুলিশ সদস্য এবং তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, যার মধ্যে একটি মেয়েশিশুও রয়েছে। এ ছাড়া এ হামলায় আরো চারজন আহত হয়েছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, এই হামলার বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, গত নভেম্বর থেকে হামাসের সাথে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় ৭০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সাথে রয়েছে। লেবাননের ইরানপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সাথেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে ইসরাইল। এই পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের সাথেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে ইসরাইল। এই পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের বাহিনী আক্রমণ চালাচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি ও ইরানের সাথে সংঘর্ষ সত্ত্বেও গাজায় ইসরাইলি হামলা থামেনি। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক মাস আগে ইরানের সাথে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় অন্তত ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী।
অন্ধকারে বন্দী গাজা : বিদ্যুৎ সঙ্কটে বিপর্যস্ত জনজীবন
গাজায় চলমান যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষ অন্ধকারে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। বহু পরিবার এখন জেনারেটর, সৌরশক্তি কিংবা ব্যক্তিগত চার্জিং পয়েন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। খবর আলজাজিরার। দেইর আল-বালাহ এলাকার বাসিন্দা আবদেল করিম সালমান প্রতিদিন সকালে নিজের ও স্ত্রীর মোবাইল চার্জ দিতে বাইরে যান, কারণ রাতের বেলা তারা ফোনের টর্চ দিয়েই তাঁবুর ভেতর আলো জোগান। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তার বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর থেকে তিনি পরিবারসহ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।
বিদ্যুতের অভাবে দৈনন্দিন জীবন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। খাবার সংরক্ষণ, শিশুখাদ্য রাখা, এমনকি পানীয় পানি ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। চার্জ দেয়ার জন্য প্রতিদিন অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা আয়হীন পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌর প্যানেল বা জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থাও বেশির ভাগ মানুষের নাগালের বাইরে। যুদ্ধের কারণে এসব যন্ত্রপাতির দাম বেড়েছে এবং সরবরাহও সীমিত। ফলে গাজার বেশির ভাগ মানুষই স্থায়ী বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ সঙ্কট শুধু আলো বা চার্জিংয়ের সমস্যা নয়; এটি স্বাস্থ্য, পানি সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সঙ্কট গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
গাজায় ক্লান্ত মানুষের টিকে থাকার লড়াই
গাজায় যুদ্ধবিরতির কয়েক মাস পরও সাধারণ মানুষের জীবন স্বাভাবিক হয়নি বরং নতুন করে অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ বাড়ছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। মূলত ইরান-সঙ্কটে বৈশ্বিক মনোযোগ সরে যাওয়ায় গাজার পরিস্থিতি আরো অবহেলিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এখনো নিয়মিত বিমান হামলা, গুলিবর্ষণ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক হামলায় বেসামরিক লোকজন নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। খাদ্য ও জ্বালানির সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে এবং অনেক পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকেই কাঠ জোগাড় করে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ গ্যাসের সরবরাহ নেই। স্বাস্থ্য খাতেও ভয়াবহ সঙ্কট বিরাজ করছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাজার হাজার রোগী বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকলেও সুযোগ সীমিত।
পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অবনতির কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে মানুষকে। বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো ধ্বংস, বিদ্যুৎ সঙ্কট ও সহায়তা প্রবাহে বাধার কারণে গাজার মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ফলে শান্তির আশা থাকলেও বাস্তবে মানুষের জীবন এখনো ভয়, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই আটকে রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় নিহত ৭০০ ছাড়াল
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০২ জন নিহত এবং ১,৯১৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭৫৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় ১০টি লাশ হাসপাতালে আনা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরো ১৮ জন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর এখন পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ২৭৮ জনে এবং আহত ১ লাখ ৭২ হাজার ১৩ জন। এ দিকে খান ইউনুসের মাওয়াসি এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর হামলায় অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নাসের হাসপাতালের সূত্র জানায়, দুইটি স্থানে বোমা হামলায় সাতজন নিহত ও চারজন আহত হন। এ ছাড়া বনি সুহেইল এলাকায় গুলিতে আরো একজন নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, খান ইউনুস উপকূলে ইসরাইলি যুদ্ধজাহাজ থেকেও গোলাবর্ষণ করা হয়। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হামলা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।



