হারুনুর রশিদ রায়পুর (লক্ষ্মীপুর)
বাংলাদেশের কৃষিখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা। সয়াবিন চাষে এই অঞ্চল এখন দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে রায়পুর উপজেলা পরিচিত হয়ে উঠছে ‘সয়াল্যান্ড’ হিসেবে। মেঘনা নদীর চরাঞ্চলজুড়ে বিস্তীর্ণ জমিতে সয়াবিন আবাদ করে নতুন স্বপ্ন বুনছেন এখানকার কৃষকরা।
উপজেলার চরবংশী, চরআবাবিল, চরঘাসিয়া ও চরকাছিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে এখন হাজার হাজার একর জমি সয়াবিনে ছেয়ে গেছে। নতুন জেগে ওঠা পলি জমি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় সয়াবিন চাষে অন্যান্য ফসলের চেয়ে খরচ কম হয়। অনেক কৃষক বছরের দুই মৌসুমে সয়াবিন আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন। আবার অনেকে সরিষা বা গমের জমিও সয়াবিনে রূপান্তর করছেন।
চলতি মৌসুমের শুরুতে সময়মতো বীজ বপন করার পর যথাসময়ে বৃষ্টি হয়েছে প্রয়োজন মতো। অতিবৃষ্টি বা খরা কোনোটিই তেমন প্রকট হয়নি। ফলে মাঠের পর মাঠ সবুজ শ্যামল সয়াবিনে ছেয়ে গেছে। গাছের উচ্চতাও ভালো। ফুল এসেছে প্রচুর। এখন গাছে গাছে শুঁটি ধরছে। কৃষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে ভালো ফলন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, সয়াবিনের জমিতে রোগবালাই বা পোকামাকড়ের তেমন কোনো আক্রমণ নেই। কৃষি বিভাগের পরামর্শে অধিকাংশ কৃষক আগাছা ও পোকা দমনের সঠিক ব্যবস্থা নিয়েছেন। বিশেষ করে ৮ নম্বর দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের কানিবগার চর ও ২ নম্বর উত্তর চরবংশী এলাকায় আবাদ হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকার মাঠজুড়ে দৃষ্টিনন্দন সবুজ সারি ইতোমধ্যে এলাকার অর্থনীতিতে আশার সঞ্চার করেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রায়পুর উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রতি হেক্টরে ফলন ২.৮ থেকে ৩ মেট্রিক টন পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বছর মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৬৭২ মেট্রিক টন। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সয়াবিন চাষে খরচ তুলনামূলক কম। একরপ্রতি খরচ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে আড়াই থেকে তিন মণ (প্রায় ১২০ কেজি) সয়াবিন ওঠে। বর্তমান বাজারে মণপ্রতি দাম তিন হাজার টাকার বেশি হলে লাভ ভালোই হবে। তবে কৃষকরা অভিযোগ করেন, গত বছর ফলন ভালো হলেও দাম কম থাকায় তেমন লাভ হয়নি। এবারো যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে অনেকে হতাশ হয়ে পড়বেন।
দক্ষিণ চরবংশীর কানিবগার চর এলাকার কৃষক আবদুল কাদের বলেন, এবার আবহাওয়া খুবই ভালো। সময়মতো বৃষ্টি হয়েছে, জমিতে পানিও জমেনি। কৃষি অফিসের পরামর্শ মেনে চাষ করেছি। গাছে শুঁটি আসতে শুরু করেছে। ফলন ভালো হবে আশা করছি। উত্তরের চরবংশীর কৃষক সোহেল মিয়া বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর খরচ কম হয়েছে। আবহাওয়া ও বাজারদর ভালো থাকলে আশানুরূপ লাভ হবে।
তবে, অনেক কৃষকই বাজারদর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই এলাকার আবুল বাশার বলেন, গত বছর ফলন ভালো হলেও দাম কম থাকায় লাভ হয়নি। এ বছরও যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে খরচ উঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। কৃষি অফিসকে দাম নিয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মাজেদুল ইসলাম বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের সচেতনতার কারণে এ বছর রায়পুরে সয়াবিনের ভালো ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমরা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি উৎপাদনে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আরো জানান, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আগাছা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তবে কৃষি বিভাগের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সয়াবিনের দাম বাজারে নিম্নমুখী হলে কৃষক নিরুৎসাহিত হবেন। জানা যায়, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল বীজের চাহিদা থাকলেও দেশে উৎপাদন হয় মাত্র দুই লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। বাকি তেলবীজ আসে বিদেশ থেকে। তাই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, রায়পুর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া সয়াবিন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সয়াবিনের সম্ভাবনাময় এ উৎপাদন দেশের তেলবীজ খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যথাযথ প্রণোদনা ও সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে সয়াবিন চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ এরই মধ্যে প্রশংসিত হচ্ছে। তবে এ ধারা ধরে রাখতে প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় ভূমিকা।


