তরুণ, নারী ও আওয়ামী ভোটারই মূল নির্ধারক

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচন কার্যত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সরাসরি দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। বেশির ভাগ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তরুণ, নারী ও আওয়ামী ভোটারই বিবেচিত হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার মূল নির্ধারক হিসেবে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা পর্ব শেষ। আগামী পরশু বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ। টানা ২০ দিনের প্রচারে সারা দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল চরমে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচন কার্যত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সরাসরি দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। বেশির ভাগ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তরুণ, নারী ও আওয়ামী ভোটারই বিবেচিত হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার মূল নির্ধারক হিসেবে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক এখন নতুন ঠিকানা খুঁজছে। এই ভোটারদের আকর্ষণ করতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই জোর প্রচার চালিয়েছে। বিএনপি নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক ও অভিজ্ঞ শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরেছে, আর জামায়াত প্রচার করেছে ‘সততা ও পরিবর্তন’-এর বার্তা।

জরিপে কার দিকে ঝুঁকছে পুরনো ভোটাররা

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের সাবেক সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকছে, তবে জামায়াতও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভোট নির্বাচনের ফলাফলে ভালো প্রভাব ফেলতে পারে।

ভোটারের বড় অংশ যুবক ও নারী

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ যুবক (১৮-৩৭ বছর) এবং প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ নারী ভোটার। এই দুই শ্রেণীকেই এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রচারের মাঠ ও অনলাইন- দুই দিকেই তৎপরতা

২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া প্রচারে দুই দলই সভা-সমাবেশ, পথ সভা এবং অনলাইন ক্যাম্পেইনে সক্রিয় ছিল। বিএনপির স্লোগান ছিল সবার আগে বাংলাদেশ, আর জামায়াত জোর দিয়েছে নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে। অর্থনীতি, দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য- এই বিষয়গুলোই ছিল প্রচারের মূল আলোচ্য।

ইশতেহারে কী প্রতিশ্রুতি

বিএনপির ৫২ দফার ইশতেহারে দরিদ্র পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড, বেকার যুবকদের ভাতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।

অন্য দিকে জামায়াতের ৪১ দফার ইশতেহারে রয়েছে যুবকদের নেতৃত্বে সরকার গঠন, মেরিটভিত্তিক নিয়োগ এবং মন্ত্রিসভায় নারীদের অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি।

নির্বাচনী মাঠে তারেক রহমান ও জামায়াত আমিরের বার্তা

নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে নিজ নিজ দলের শক্ত অবস্থান ও প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী সমাবেশে বলেন, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের নয়, এটি জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই। তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। নারী ভোটারদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে বলেন, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনই জামায়াতের লক্ষ্য। তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মেধা ও সততার ভিত্তিতে প্রশাসন গড়ে তোলা হবে এবং তরুণদের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা হবে। নারী ভোটারদের উদ্দেশে তিনি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন।

জরিপে ব্যবধান খুবই কম

সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও জামায়াত প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখনো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোটার অনির্ধারিত, যাদের বেশির ভাগই যুবক ও নারী। যদিও এ পর্যন্ত প্রকাশিত জরিপগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও দেখা গেছে।

যুব ভোটার কী চায়

যুব ভোটাররা মূলত কর্মসংস্থান, সুশাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেউ কেউ জামায়াতের পরিবর্তনের বার্তায় আকৃষ্ট হচ্ছেন, আবার অনেকে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখছেন।

নারী ভোটারদের ভাবনা

নারী ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক অর্থনৈতিক সুরক্ষা। বিএনপির সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও জামায়াতের নারী-বান্ধব প্রতিশ্রুতি- দুই দিকই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

ফলাফল কোন দিকে

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার উপস্থিতি যদি ৭০-৮০ শতাংশ হয়, তাহলে যুবক ও নারী ভোটারদের প্রভাব আরো স্পষ্ট হবে। অনেক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কারণে ত্রিমুখী লড়াইও দেখা যেতে পারে।

শুধু সরকার নয়, ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রশ্ন

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ধারার দিকনির্দেশনা দেবে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়িত হয়, তার বড় পরীক্ষা হবে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট।