ফরিদ মিয়া দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল)
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ততই বাড়ছে। ভোটের মাঠে নতুন নতুন সমীকরণ ও নাটকীয়তায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এই আসন। শুরু থেকেই বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীকে ঘিরেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিললেও শেষ সময়ে এসে বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে জামায়াত ইসলামীকে ঘিরে বাড়ছে আলোচনা।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রবিউল আওয়াল লাভলু। দলীয় হাইকমান্ডে তার অবস্থান শক্ত বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দীর্ঘ দিন ধরে দলের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। সভা-সমাবেশ, মিছিল ও গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে সমর্থন চাইছেন তারা। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিশ্বাস, ঐতিহ্যগত জনপ্রিয়তাই এবার তাদের বিজয় নিশ্চিত করবে।
তবে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জুয়েল সরকার। বিএনপিতে তার বড় কোনো পদ না থাকলেও দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে দলের একটি অংশ ও স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। ৫ আগস্টের পর থেকেই তিনি নিজেকে প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরে নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে আসছেন, যা বিএনপির ভোটে বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
টাঙ্গাইল-৬ আসনটি নাগরপুর উপজেলার ১২টি ও দেলদুয়ার উপজেলার আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৬৮ হাজার ৭৬ জন। রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৩ সালের নির্বাচন ছাড়া প্রায় সব নির্বাচনেই বিএনপির দখলে ছিল এই আসন। ১৯৯১ সালে খন্দকার আবু তাহের এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তী টানা দুইবার এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে যায়। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় হারানো আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি।
জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হবে। তিনি দাবি করেন, দেলদুয়ার-নাগরপুরের ভোটাররা ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করবেন।
অন্যদিকে দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগের মুখে থাকা জামায়াত ইসলামী এবার নতুন উদ্দীপনায় মাঠে নেমেছে। জামায়াতের প্রার্থী ডা: এ কে এম আব্দুল হামিদ দিন-রাত ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গিয়ে তিনি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। শেষ সময়ে জামায়াতের সক্রিয় প্রচারণা ও সংগঠিত মাঠকর্মীদের উপস্থিতি ভোটের অঙ্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ডা: এ কে এম আব্দুল হামিদ বলেন, মানুষ অতীতের শাসনব্যবস্থায় বিরক্ত। তারা পরিবর্তন চায় এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে সেই পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেবে। তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে রয়েছে এবং জামায়াতের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা চান তিনি।
এদিকে সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা দল নয়, যোগ্য ও সৎ প্রার্থীকে ভোট দিতে আগ্রহী। ভোটারদের মতে, যিনি ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতি করবেন না, চাঁদাবাজি ও দলীয় দাপট দেখাবেন না এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করবেন, তার পক্ষেই তারা রায় দিতে চান। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে বিএনপির ঐতিহ্যগত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইল-৬ আসনে শেষ মুহূর্তে জামায়াতের জোরালো উপস্থিতি ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ভোটের সমীকরণকে করে তুলেছে আরো জটিল ও আগ্রহউদ্দীপক।



