নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে জীবনযাত্রায় নতুন চাপ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের দাম। সবজি, ডিম, পেঁয়াজ, আদা, মাছ ও মুরগির দামে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়ায় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কিছু পণ্যের চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্র। ফলে সাধারণ মানুষের সংসার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ৫০-৬০ টাকার নিচে আলু ছাড়া কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। ঢ্যাঁড়স, পটোল, ধুন্দুল, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, টমেটোসহ বেশিরভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। বেগুনের দাম মানভেদে ৯০ থেকে ১২০ টাকা, বরবটি ও কাঁকরোল ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মওসুম না থাকায় পেঁপেও মিলছে না ৮০-৯০ টাকার নিচে।

এ দিকে চলতি সপ্তাহে নতুন করে বেড়েছে পেঁয়াজ ও আদার দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশী পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে, যা গত সপ্তাহে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। আদার দামও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রসুনের দামও মানভেদে বেড়েছে কেজিতে ২০-৩০ টাকা।

রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গতকাল কয়েক ধরনের সবজি, মাছ, মুরগি, চাল ও ডিম কিনতেই তার আগের তুলনায় অতিরিক্ত ২১০ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান।

তিনি বলেন, এক মাস আগেও যে বাজার এক হাজার টাকার মধ্যে করা যেত, এখন সেখানে ১২০০ টাকার বেশি লাগছে। বেতন তো বাড়ে না, কিন্তু প্রতিদিনই বাজারের দাম বাড়ছে। সংসার চালাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি জানান, এক কেজি করে বরবটি, কাঁকরোল, বেগুন এবং আধা কেজি ধুন্দুল কিনতেই তার খরচ হয়েছে ৩৪০ টাকা। অথচ দুই মাস আগেও একই পরিমাণ সবজি কিনতে খরচ হয়েছিল ২৬০ টাকা। অর্থাৎ শুধু সবজিতেই অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে ৮০ টাকা।

মুরগির বাজারেও একই অবস্থা। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজির নিচে নামছে না। রোজার মধ্যেও যার কেজি ছিল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। ফলে দেড় কেজির একটি ব্রয়লার কিনতে সাজেদুলকে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।

ডিমের বাজারও অস্থির হয়ে উঠেছে। বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকা। পাড়া-মহল্লার দোকানে এ দাম আরো বেশি, কোথাও কোথাও ১৫৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

গতকাল মিরপুরের দুয়ারীপাড়া বাজারে খুচরা বিক্রেতা আব্দুর রহমান বলেন, পাইকারি বাজারে প্রতিদিনই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। আমরা বেশি দামে কিনছি, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পেঁয়াজ ও আদার চাহিদা বেড়েছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, চাহিদাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বাজার অস্থির করা হচ্ছে। তাদের মতে, রমজানে যেভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন তদারকি কমে যাওয়ায় আবারো দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মিরপুর ৬ বাজারে আব্দুল হালিম নামে একজন ক্রেতা বলেন, সরবরাহ সঙ্কটের কথা বলে যখন-তখন দাম বাড়ানো এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাজারে কার্যকর মনিটরিং না থাকায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, পাম তেল, মসুর ডাল, ডিম, পেঁয়াজ, মুরগি, মাছ ও বিভিন্ন মসলার দাম বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কার্যকর নজরদারির অভাবে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। তারা মনে করছেন, ঈদ সামনে রেখে এখনই কঠোর বাজার তদারকি না বাড়ালে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানান, চট্টগ্রামে সবজির মূল্য বেড়েছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের যেন নাভিশ^াস উঠেছে। কিছু সবজির কেজি এখন রীতিমতো ১০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অন্য দিকে হঠাৎ করেই বেড়েছে ডিমের মূল্য। মাছ-গোশতের দামও চড়া।

বৃষ্টির অজুহাতে সবজির দাম বাড়লেও কোনো কারণ ছাড়াই বেড়েছে ডিমের মূল্য। তবে সরবরাহে ঘাটতি থাকায় ডিমের দাম বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজি বিক্রেতারা প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, ঢেঁড়স ১০০, বরবটি ৯০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১০০ থেকে ১২০, পটোল ৬০ থেকে ৮০, বাঁধাকপি ৮০, শসা ৮০ টাকা, কচুরমুখি ৮০, পেঁপে ৬০, ধুন্দল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ঝিঙে ৮০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৪০ টাকা করে বিক্রি করছেন।

তবে এখন সবচেয়ে কমমূল্যে পাওয়া যাচ্ছে লেবু। বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লায় প্রতি ডজন ছোট সাইজের লেবু ৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। ভোক্তারা বলছেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে সবজির দাম দ্বিগুণ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চাষিদের কাছ থেকে স্বাভাবিক দামে পাইকারি সবজি কিনে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে ইচ্ছামতো ক্রেতাদের কাছ থেকে খুচরা দাম হাতিয়ে নিচ্ছেন।

তবে বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, বৃষ্টিতে সারা দেশে সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই দাম বাড়ছে। বাজারে কোনো সিন্ডিকেট নেই। বেশি দামে সবজি ক্রয় করে, বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ভোক্তারা বলছেন, হঠাৎ করেই বেড়েছে প্রায় সব ক’টি সবজির দাম। দেখার যেন কেউ নেই। আগে ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করত। এখন চোখে দেখি না। বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা। গত মাসে সোনালি মুরগির কেজি ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। এখন বেড়ে হয়েছে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা। আর দেশী মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা কেজি। বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের মাছ। সাগরের মাছের সরবরাহ বন্ধ থাকায় চাষের মাছের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙ্গাশ ২০০ টাকা, রুই মাছ ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায, বড় কাতলা ৪০০ টাকা, পোয়া মাছ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, পাবদা মাছ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ডিমের বাজারে অস্থিরতা

খামার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতি পিস ডিমের দামে তৈরি হয়েছে ব্যবধান। গত কয়েক মাস আগে যে ডিম খামারিরা বিক্রি করত সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকায়, সেই ডিম এখন বিক্রি করছে ১০ টাকা ৭০ পয়সায়। ডজনপ্রতি ডিমের দাম ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। এ ছাড়া বাজারে হাঁসের ডিম এক ডজন ১৮০ টাকা।