আবদুল কাইয়ুম শেখ
আকিদা একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো- আস্থা, বিশ্বাস, ধর্মমত ও মতাদর্শ। আর শরিয়তের পরিভাষায় আকিদা বলা হয় মানবজাতির ওপর ইসলাম কর্তৃক আরোপিত এমন অকাট্য ধর্মবিশ্বাস যা লালন করা ছাড়া কোনো ব্যক্তি ঈমানদার বলে গণ্য হতে পারে না। প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য অপরিহার্য হলো- মহান আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করা, ফেরেশতাদের অস্তিত্ব স্বীকার করা, আসমানি গ্রন্থগুলোর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা, মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নবী-রাসূল প্রেরিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা, পরকাল সঙ্ঘটিত হওয়ার ওপর আস্থা স্থাপন করা এবং ভালো-মন্দ যা কিছু হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস করা। এসব বিশ্বাসই ইসলামের দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ আকিদা বলে গণ্য। এগুলোর বিপরীতে যত তন্ত্র, মন্ত্র, মত, পথ ও মতবাদ রয়েছে সেগুলোর সবই ভ্রান্ত।
আল্লাহর ওপর ঈমান : পরাক্রমশালী আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি কেউ শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর কোনো সত্তার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে তার শক্তি, ক্ষমতা ও মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে দুর্বল কোনো সত্তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করলে তেমন কোনো উপকার হয় না; বরং অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এ বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত যে, মহামহিম আল্লাহ সর্বময় শক্তির অধিকারী ও ক্ষমতাধর। তার মতো মহীয়ান- গরীয়ান আর কেউ নেই। অতএব, যদি কোনো ব্যক্তি এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে তার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে সে বিপুল আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে অপরাজেয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যে তাগুতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে সে এমন এক মজবুত হাতল ধরবে যা কখনো ভাঙবে না।’ (সূরা বাকারা-২৫৬)
মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান মানুষকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। তার সম্মান, গৌরব ও মহত্ত্ব বাড়িয়ে দেয়। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসস্থাপন ও সৎকর্ম সম্পাদন মানুষকে বিশ্বের সব সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠ করে তোলে। পবিত্র কুরআনে এসেছে- ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির সেরা।’ (সূরা বাইয়িনাহ, আয়াত-৭) পক্ষান্তরে ঈমানবিমুখতা, পৌত্তলিকতা, মূর্তিপূজা ও বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা মানুষকে সব সৃষ্টির চেয়ে নিকৃষ্ট বানিয়ে দেয়। সাথে সাথে সে জাহান্নামের চিরন্তন অধিবাসী হওয়ার যোগ্য হয়ে যায়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এসেছে- ‘কিতাবিদের মধ্যে যারা কুফরি করে তারা ও মুশরিকরা জাহান্নামের অগ্নিতে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; এরাই সৃষ্টির অধম।’ (সূরা বাইয়িনাহ, আয়াত-৬)
ফেরেশতাদের ওপর ঈমান : ফেরেশতাদের অস্তিত্বে বিশ্বাসস্থাপন করাও ঈমানের অন্যতম অংশ। ফেরেশতারা আল্লাহর সৃষ্ট। তারা নূরের তৈরি। মহান আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করেছেন তার আনুগত্য করার জন্য। ফেরেশতারা কোনো অবস্থায়ই আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতা করে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যা আদেশ করেন তা তারা পালন করে ও যা নিষেধ করেন তা থেকে নিবৃত্ত থাকে। পানাহার ও যৌন কামনা-বাসনার মতো মানবীয় স্বভাব-চরিত্র হতে তারা ঊর্ধ্বে। তারা অসংখ্য ও অগণিত। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন, হজরত জিবরাইল আ:, হজরত মিকাইল আ:, হজরত আজরাইল আ: ও হজরত ইসরাফিল আ:। তারাসহ আরো যত ফেরেশতা রয়েছেন তাদের সবার অস্তিত্ব ও কাজকর্মে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অংশ। ফেরেশতাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হজরত আয়েশা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘ফেরেশতাদের নূর দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে আর জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে নির্ধূম অগ্নিশিখা থেকে। আর হজরত আদম আ:-কে সৃষ্টি করা হয়েছে ওই বস্তু থেকে যে সম্পর্কে তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে।’ (মুসলিম-৭৩৮৫)
যদি কোনো ব্যক্তি ফেরেশতাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। কেননা হজরত জিবরাইল আ: নবী-রাসূলদের কাছে ওহি নিয়ে আগমন করতেন। হজরত ইসরাফিল আ: কিয়ামতের সময় শিঙ্গায় ফুৎকার করবেন। হজরত আজরাইল আ: সৃষ্টিকুলের প্রাণ সংহার করেন। আর হজরত মিকাইল আ: বৃষ্টি ও রিজিকের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তা ছাড়া ডান ও বাম কাঁধে বসে মানুষের আমলনামা লিপিবদ্ধ করার কাজও সম্মানিত ফেরেশতারা সম্পন্ন করেন। সুতরাং যদি কেউ ফেরেশতাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তাহলে প্রকারান্তরে আল্লাহর ওহি, কিয়ামত, মানুষের কর্মের প্রতিদান ও পরকাল প্রভৃতিকে অস্বীকার করা হয় যা ঈমানের পরিপন্থী।
আসমানি গ্রন্থগুলোর উপর ঈমান : বিশ্ব মানবের জীবনবিধান হিসাবে নবী-রাসূলের উপর যেসব আসমানি গ্রন্থ নাজিল হয়েছে সেগুলোর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। মানবজাতির হেদায়েত ও পথপ্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ যুগে যুগে বিভিন্ন গ্রন্থ নাজিল করেছেন। এসব গ্রন্থে তিনি কালের চাহিদার নিরিখে মানুষের জীবন চলার পথ বাতলে দিয়েছেন। কোন কাজ করণীয় ও কোন কাজ বর্জনীয় তার পথনির্দেশ করেছেন। কোথায় মানুষের কল্যাণ ও অকল্যাণ তা বর্ণনা করেছেন। এসব গ্রন্থের মাধ্যমে মহান আল্লাহ নিজের নির্দেশাবলি মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ঐশী গ্রন্থের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ হলো আলকুরআন যা বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওপর নাজিল হয়েছে। মহান আল্লাহ এই কুরআনকে হিফাজত করার দায়িত্ব নিজের জিম্মায় নিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং অবশ্যই আমি একে হিফাজত করব।’ (সূরা হিজর, আয়াত-৯) সুতরাং মহাগ্রন্থ আলকুরআন আল্লাহর বাণী হিসেবে অবিকৃতভাবে বহাল থাকার বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করতে হবে। সাথে সাথে পূর্ববর্তী সব আসমানি কিতাবের উপরও বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কেননা কুরআন পূর্ববর্তী সব ঐশী গ্রন্থকে সত্যায়ন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-‘তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা এর আগের কিতাবের সমর্থক। আর তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৩) আলোচ্য আয়াতে কুরআন শরিফ, তাওরাত ও ইঞ্জিলকে মহান আল্লাহর নাজিলকৃত বাণী বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাই মানুষের জন্য অপরিহার্য হলো আল্লাহ তায়ালা নাজিলকৃত মহাগ্রন্থ আল কুরআনসহ আসমানি অন্য সব গ্রন্থের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। যদি কোনো ব্যক্তি ঐশী গ্রন্থসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন না করে, তাহলে সে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে স্বেচ্ছাচারী ও বেঈমান হয়ে যায়।
নবী-রাসূলদের ওপর ঈমান : মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বমানবতার হেদায়েত ও পথপ্রদর্শনের জন্য নবী-রাসূলদের প্রেরিত হওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস করা ঈমানের অন্যতম অংশ। মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে বহু জাতি-গোষ্ঠী পাঠিয়েছেন। বহু দল, উপদল ও সম্প্রদায় প্রেরণ করেছেন। তারা সবাই আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর গোলাম ও দাস হিসেবে তাদের জন্য কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় ছিল। আল্লাহর পবিত্রতম সত্তা বহু ঊর্ধ্বের হওয়ায় তার জন্য প্রতিটি ব্যক্তির কাছে গিয়ে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় জানিয়ে দেয়া সমীচীন ছিল না। এ জন্য তিনি প্রত্যেক জাতি ও সম্প্রদায়ের কাছে নিজের রাসূল বা দূত প্রেরণ করেন। এমন কোনো জাতি ও সম্প্রদায় অতিবাহিত হয়নি, যাদের কাছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও ভীতি প্রদর্শনকারী আসেনি। সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা নবী-রাসূলরা এসে আপন যুগের লোকদের মহান আল্লাহর বাণী শোনাতেন এবং তাদের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়ে নবী-রাসূল আসা ও তাদের কর্মের ধরন সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আমি তোমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে; এমন কোনো সম্প্রদায় নেই যার কাছে সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি।’ (সূরা ফাতির, আয়াত-২৪) অন্য সূরায় আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সাথে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা হাদিদ, আয়াত-২৫) উল্লিখিত দু’টি আয়াতে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের কাছে নবী-রাসূল ও সতর্ককারী আসার ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে। তাই আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত নবী-রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের আনীত কথামালাকে আল্লাহর বাণী বলে মেনে নিতে হবে। অন্যথায় বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহর সমুদয় বাণী মিথ্যায় পর্যবসিত হবে।
নবুয়তের ধারা শেষ হওয়ার ঈমান : নবী-রাসূল আগমনের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে এই আকিদাও পোষণ করতে হবে যে, সর্বশেষ নবী ও রাসূল হলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:। তার শুভাগমনের মাধ্যমে নবী রাসূলদের আগমনের ধারা শেষ হয়ে গেছে। তারপর আর কোনো নবী ও রাসূল এই পৃথিবীতে আগমন করবে না। বিশ্বনবী সা: সর্বশেষ নবী ও রাসূল মর্মে আল কুরআনে এসেছে- ‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নয়; বরং সে আল্লাহর রাসূল ও শেষনবী। আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আহজাব, আয়াত-৪০) বিশ্বনবী সা: নিজেও দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের অবস্থা এমন, এক ব্যক্তি যেন একটি গৃহ নির্মাণ করল; তাকে সুশোভিত ও সুসজ্জিত করল, কিন্তু এক পাশে একটি ইটের জায়গা খালি রয়ে গেল। এরপর লোকজন এর চারপাশে ঘুরে আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল- ওই শূন্যস্থানের ইটটি লাগানো হলো না কেন? মহানবী সা: বলেন, আমিই সে ইট। আর আমিই সর্বশেষ নবী।’ (বুখারি-৩৫৩৫)
পরকালের ওপর ঈমান : পরকালের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বিশ্বাস ছাড়া কেউ ঈমানদার হতে পারে না। অবশ্য পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করার অর্থ হলো- মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়া ও পার্থিব জীবনে সম্পন্ন করা সব কাজের প্রতিদান পাওয়ার মনোভাব পোষণ করা। মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও দুনিয়ার জীবনের কার্যকলাপের প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস মাটির মানুষকে সোনার মানুষে পরিণত করে। পৃথিবীর বুকে যত অন্যায় ও অপরাধ সঙ্ঘটিত হয় সেগুলো পরকালে বিশ্বাস না থাকা কিংবা দুর্বল থাকার কারণে হয়। যদি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পর আবারো জীবিত হওয়ার বিশ্বাস রাখে, তাহলে সেই বিশ্বাস তাকে সব রকমের অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি ও কদাচার থেকে বিরত থাকতে অনুপ্রাণিত করে। পক্ষান্তরে কোনো লোক যদি পরকালে বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে আল্লাহর আজাবের কোনো ভয় তার থাকে না। আল্লাহ তায়ালার সামনে জবাবদিহিতার কোনো চিন্তাও তার মনে উদয় হয় না। সে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। সব ধরনের অন্যায়, অনাচার ও পাপাচারের পথে তার কোনো অন্তরায় থাকে না। এ জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য স্বপ্নের পৃথিবী গড়ার জন্য পরকালে বিশ্বাসের বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেয়া হবে। যাকে অগ্নি থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে দাখিল করা হবে সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত অন্য কিছু নয়।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৮৫) আলোচ্য আয়াতে পরকালের মূলতত্ত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। তাই প্রতিটি মুসলমানকে অবশ্যই মৃত্যুর পর আবারো জীবিত হওয়া ও পার্থিব জীবনে সম্পাদিত সব কাজের প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস রাখতে হবে।
তাকদিরের ওপর ঈমান : এই মহাবিশ্বে যা কিছু হয় তার সবই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস পোষণ করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। এর নাম তাকদিরের প্রতি ঈমান। পৃথিবীর বুকে প্রত্যহ যা ঘটছে তার সবই আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনা, অবগতি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঘটছে। কোনো গ্রহ ও রাশির প্রভাব তাতে ক্রিয়াশীল নয়। যে ব্যক্তি তাকদিরের এই বিশ্বাস অন্তরে লালন করে সে হতাশা ও নিরাশা হতে মুক্ত থাকে। এমন লোক কোনো তান্ত্রিক, গণক ও ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে যায় না। কাউকে নিজের হাতের রেখা দেখিয়ে ভাগ্য জানতে চায় না। কোনো মাজার বা ভণ্ড পীর ফকিরের দ্বারস্থ হয় না। কিছু পাওয়ার পর সে অধিক পরিমাণে উল্লসিত হয় না। আবার কোনো কিছু না পাওয়ার কারণে অত্যধিক বেদনাহত হয় না। না পাওয়ার বিরহ তাকে কাতর করতে পারে না। সে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা হতে মুক্ত থাকে। তার কাজকর্মে ভারসাম্য থাকে। সে মহান আল্লাহর এই বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখে যে-‘পৃথিবীতে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে তা সংঘটিত করার আগেই লিপিবদ্ধ থাকে; আল্লাহর পক্ষে এটি খুবই সহজ।’ (সূরা হাদিদ, আয়াত-২২) আল্লাহ তায়ালা নির্ধারিত নিয়ামত পাওয়ার বিশ্বাস মানুষকে কর্মবিমুখ নয়; বরং কর্মচঞ্চল রাখে। অবশ্য হালাল-হারামের বাছ-বিচার না করে সে অঢেল ধনসম্পদ সঞ্চয় করতে যায় না। কারণ সে বিশ্বাস করে, আমার ভাগ্যে যা নির্ধারিত আছে তা অবশ্যই অর্জিত হবে। আমার জন্য আল্লাহ নির্ধারিত নিয়ামত অন্য কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
ভ্রান্ত আকিদার পরিণাম : ইসলামের দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস বলতে আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি গ্রন্থাবলি, রাসূলগণ, পরকাল ও তাকদিরের ওপর বিশ্বাস স্থাপনকে বুঝায়। যেসব লোক নির্ভেজালভাবে এসব আকিদা অন্তরে লালন করবে তারা ইসলামের দৃষ্টিতে মুমিন বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে যারা এসব বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করবে না তারা বেঈমান হয়ে যাবে। ইহকালীন জীবনকে সুখময় ও শান্তিময় করতে এবং পরকালীন জীবনে চিরন্তন আজাব থেকে মুক্তি পেতে বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস লালন করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। কেননা, বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাসের অধিকারী সৎকর্মশীল মুমিনরা চির সুখের জান্নাতে চিরকাল বসবাস করবে। পক্ষান্তরে অশুদ্ধ আকিদার বাহক বেঈমান কাফেররা সবসময় নরকের আগুনে প্রজ্বলিত হতে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে অগ্নিতে দগ্ধ করবই; যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চর্ম সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। যারা ঈমান আনে ও ভালো কাজ করে তাদেরকে দাখিল করব জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে, সেখানে তাদের জন্য পবিত্র স্ত্রী থাকবে এবং তাদেরকে চিরস্নিগ্ধ ছায়ায় দাখিল করব।’ (সূরা নিসা, আয়াত : ৫৬-৫৭)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ, পোস্তা, চকবাজার, ঢাকা।



