পুলিশের সংবাদ সম্মেলন

সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে নওগাঁয় পরিবারের ৪ জনকে হত্যা

Printed Edition

পত্নীতলা (নওগাঁ) সংবাদদাতা

নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। সেই সাথে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতারের কথাও জানানো হয়েছে। গত বুধবার দুপুরে নওগাঁর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

গত সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে এক দম্পতি ও তাদের দুই শিশুসন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন, বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩৫), তার স্ত্রী পপি সুলতানা এবং তাদের সন্তান পারভেজ রহমান (৯) ও সাদিয়া আক্তার (৩)।

এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া তিন ব্যক্তি হলেন, নিহত হাবিবুরের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম (৫০), তার ভাগনে সবুজ রানা (২০) ও শাহিন হোসেন (৩০)। গ্রেফতার তিনজনেরই বাড়ি বাহাদুরপুর গ্রামে।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, নিহত হাবিবুর রহমানরা ছয় ভাই-বোন। তারা এক ভাই ও পাঁচ বোন। সম্প্রতি হাবিবুরের বাবা তার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তার সম্পত্তি লিখে দেন। তিনি তার ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা সম্পত্তি ছেলে হাবিবুর রহমানকে লিখে দেন। বাকি সম্পত্তি তার মেয়েদের লিখে দেন। হাবিবুরকে বেশি সম্পত্তি দেয়ায় বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনেদের সাথে হাবিবুরের বিরোধ তৈরি হয়। বেশ কিছু দিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এটা নিয়ে গ্রাম্য সালিস বৈঠকও হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেফতার তিনজনের মধ্যে শহিদুল ও সবুজ রানা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে হাবিবুরের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম, তার ছেলে শাহিন ও হাবিবুরের আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে। গত সোমবার বিকেলে হাবিবুর তার ভাগনে সবুজ রানাকে নিয়ে উপজেলার ছাতড়া বাজারে গরু কিনতে যান। হাবিবুর এক লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে গিয়েছিলেন। পরে গরু না কিনেই বাড়িতে ফিরে আসেন। বাজার থেকে ফেরার পর গ্রামের একটি মাঠে গিয়ে সবুজ রানা, শহিদুল, শাহিনসহ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছয়জন পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার রাত ৮টার দিকে সবুজ হাবিবুরের বাড়িতে যায়। তিনি তার মামা-মামী ও মামাতো ভাই-বোনদের সাথে একসাথে খাবার খায়। ওই সময় সবার অগোচরে হাবিবুরের আরেক ভাগনে বাড়িতে প্রবেশ করে একটি ঘরে লুকিয়ে থাকে। সবুজ খাবার খেয়ে বের হয়ে যায়। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন বাড়ির মূল দরজা খুলে দিলে সবুজ, শহিদুলসহ আরো পাঁচজন বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে হাবিবের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরের বাইরে থেকে শিকল তুলে দেয়। এরপর হাবিবের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করে। হাবিবের স্ত্রী পপি সুলতানা দুই সন্তানকে নিয়ে পাশের ঘরে ছিল। হাবিবকে হত্যা করার সময় পপি বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়। বাড়ির আঙিনায় বের হওয়ার সাথে সাথে পপির মাথায় হাঁসুয়া দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে তাকেও গলা কেটে হত্যা করে। পরে হাবিবের পুরো পরিবারকে নির্বংশ করার উদ্দেশ্যে তার দুই সন্তান পারভেজ রহমান ও সাদিয়াকে গলা কেটে হত্যা করে।

এসপি বলেন, মঙ্গলবার সকালে ঘটনা জানাজানি হলে সবুজ রানা, শহিদুল ও শাহিন হাবিবের বাড়িতে আসেন। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার তদন্তে নেমে মঙ্গলবারই নিহত হাবিবের ভাগনে সবুজ, তার বাবা নমির উদ্দিন, দুই বোন ডালিমা বেগম ও হালিমাসহ ছয়-সাতজনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে হাবিবের ভাগনে সবুজ রানা পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে গ্রামের একটি খড়ের পালায় লুকানো অবস্থায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাঁসুয়া উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের একটি পুকুর থেকে বুধবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সবাইকে হত্যার কারণ হিসেবে শহিদুল ও সবুজ রানা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে, নির্বংশ করলে পরবর্তীতে হাবিবের নামে থাকা সম্পত্তির ভাগীদার তারা হবে। এই ভাবনা থেকেই তারা পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে।