চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে ক্ষোভ অনলাইনে সুফল মিলবে না

Printed Edition

- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও অফলাইনে কাসের সুযোগ

- প্রাথমিকে অনলাইন কাস নয় জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী

শাহেদ মতিউর রহমান

অনলাইন কাসে রাজি নন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এমনকি অভিভাবকরাও। তবু সরকারের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে সরাসরি মুখ খুলতে পারছেন না শিক্ষকরা। তবে তারা বারবারই বলছেন অনলাইন কাসের কোনো সুফল শিক্ষার্থীরা পাবে না। এমনকি সরকার যে কারণে অনলাইন কাসের বিষয়ে এত বেশি পিড়াপিড়ি করছেন সেই জ¦ালানি সাশ্রয়েও সরকার তথা দেশের বিশেষ কোনো লাভ এই মুহূর্তে হবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার এবং এর আগে গত বুধবার দুই দিনই রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই এমন তথ্য জানিয়েছেন। অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী কিছুটা কৌশলী কায়দায় নিজেকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার জন্য বলেছেন, অনলাইনে কাসে ফিরতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হবে না। তবে কেউ চাইলে অনলাইনে কিংবা অফলাইনেও কাস চালিয়ে নিতে পারবেন।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই জ¦ালানি সাশ্রয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে স্কুল কলেজের কাস সশরীরে না করে কিছু দিন অনলাইনে কাস চালানোর কথা বলেছিলেন। এরপর থেকেই মূলত শিক্ষামন্ত্রী নিজেও অনলাইনে কাস চালু করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। প্রথমে গত মার্চ মাসের শেষ দিকে মিরপুরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতরে (ডিপিই) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় শিক্ষকদের প্রায় সবাই স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইনে কাসের কোনো সুফল পাবে না। কেননা তাদের কারোরই বাবা অথবা মায়ের ব্যবহারের কোনো ডিভাইজ বা মোবাইল নেই। ফলে প্রাথমিকের জন্য এই সিদ্ধান্ত বিন্দুমাত্র কার্যকর কোনো সুফল আনবে না। বরং কাস বন্ধ রাখার পক্ষেই মত দিয়ে তারা বলেন, তবু অনলাইনে কাস চালুর কোনো সিদ্ধান্ত যেন না নেয়া হয়। অবশ্য এর কয়েক দিন পরেই শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রাথমিকের শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মনে অভিব্যক্তি বুঝতে পেরে তিনি ঘোষণা করেছেন প্রাথমিকের অনলাইনে কাস চালু করার সিদ্ধান্ত আপাতত নিচ্ছে না সরকার।

অবশ্য মাধ্যমিক এবং কলেজের কাস অনলাইনে চালু করার বিষয়ে নানাভাবে যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকেও সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়েছে। এমন অনেক অভিভাবকও অনলাইন কাসের পক্ষে তারা নন এটা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদের বাইরে বিভিন্ন আলোচনায় শিক্ষার্থীদের অনলাইনের নামে তাদের ক্যারিয়ার এমনকি জীবনকে ধ্বংস না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য মতে, আগামীকাল শনিবার থেকেই শিার্থীদের সরাসরি শিাপ্রতিষ্ঠানে এনে কাস করাতে চায় শিা মন্ত্রণালয়। সে েেত্র রোববার অনলাইনে শিা কার্যক্রম চলবে। শিা এবং প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শনি-সোম-বুধবার অফলাইনে বা সশরীরে কাস চলবে। আর বাকি দিনগুলো চলবে অনলাইন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর দনিয়া কলেজে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ এবং ইউনিসেফের’ যৌথ আয়োজনে এক অনুষ্ঠান শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান শিামন্ত্রী। এ সিদ্ধান্ত শুধু বড় শহরের বেশি শিার্থী থাকা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিকভাবে বাস্তবায়ন হবে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘শনিবার স্কুলে এসে কাস হবে। রোববার অনলাইনে, সোমবার অফলাইনে, মঙ্গলবার অনলাইনে, বুধবার অফলাইনে এবং বৃহস্পতিবার অনলাইনে কাস হবে। তিন দিন অনলাইনে ও তিন দিন অফলাইনে হবে। এটি মহানগর ও মেট্রোপলিটন এলাকায় হবে। সারা দেশে নয়।’

এ সিদ্ধান্ত আগামী সোমবার থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে জানিয়েছেন শিামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শিকরা বিদ্যালয়ে গিয়েই এ অনলাইনে কাস শুরু করবেন।’ ওয়াইফাইসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। মেট্রোপলিটন এলাকার যেসব প্রতিষ্ঠানে শিার্থী বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানে এ সিদ্ধান্ত শুরুতে বাস্তবায়ন হবে জানিয়ে শিামন্ত্রী বলেন, ‘সব প্রতিষ্ঠানকে এটিকে বাধ্য করা হচ্ছে না। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না, যাতে শিাব্যবস্থায় ধস নামে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর অনলাইন কাসের সমতাসম্পন্ন এমন কিছু নির্বাচিত শিাপ্রতিষ্ঠানে পরীামূলকভাবে এই পদ্ধতি চালু করা হবে। এর মূল ল্য হচ্ছে নগরীর যানজট হ্রাস, জ্বালানি সাশ্রয় এবং শিার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। শিামন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান এটি কোনো বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নয়; বরং একটি পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ। যেসব প্রতিষ্ঠান সম, তারা স্বেচ্ছায় এই পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করবে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের ব্যবস্থা আরো বিস্তৃত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

শিামন্ত্রী জানান, আপাতত ঢাকা মহানগরীর বড় ও যানজটপ্রবণ এলাকার রিনাউনড শিাপ্রতিষ্ঠানে এই পদ্ধতি ‘পাইলট প্রকল্প’ হিসেবে চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘এটি সবার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে না। যারা সমতা রাখে, সেই শিা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে আমরা এই ‘ব্লেন্ডেড এডুকেশন’ বা সমন্বিত শিা কার্যক্রম শুরু করছি।

এক অভিভাবকের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, আমরা এই নতুন সিদ্ধান্ত কিছু শিাপ্রতিষ্ঠানের জন্য, যেখানে ৯০ শতাংশের বেশি গাড়ি নিয়ে যায় সেগুলো। এ সময় পরীা সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেছেন, সুন্দর পরিবেশে পরীা দেবে তোমরা, ভয়ের কারণ নেই। কোনো ভীতি যেন প্রদর্শন করা না হয়। ভীতির কোনো প্রয়োজন নেই, সুন্দর পরিবেশে পরীা।