গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ৪

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বিশ্বের নজর যখন ইরান যুদ্ধের দিকে নিবদ্ধ, তখন গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনী তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, মাগাজি শরণার্থী শিবিরের প্রবেশপথে একটি বেসামরিক যানবাহনে ইসরাইলি বাহিনী হামলা চালালে এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের দেইর আল-বালাহ-র আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। গাজা শহরের পূর্বদিকের একটি এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় আরো দু’জন নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরে নতুন করে ইসরাইলি হামলায় অন্তত চারজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শনিবার ও রোববার ভোরে গাজায় পৃথক ড্রোন হামলায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একই সময়ে পশ্চিমতীরের দু’টি গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি ও খামারে আগুন দিয়েছে ইসরাইলি দখলদাররা।

চিকিৎসা সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, রোববার ভোরে পূর্ব গাজা সিটির আল-তুফাহ এলাকার আল-শাওয়া স্কোয়ারের কাছে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তাকর্মীদের একটি দলের ওপর ইসরাইলি ড্রোন হামলা চালায়। এতে তিনজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। হতাহতদের গাজা সিটির আল-আহলি ব্যাপটিস্ট ও আল-শিফা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।

এর আগে শনিবার মধ্য গাজার মাগাজি শরণার্থী শিবিরের বিপরীতে সালাহুদ্দিন সড়কে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইসরাইল। এতে একজন নিহত এবং তিনজন আহত হন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গাজার অন্যান্য অংশেও ইসরাইলি নৌবাহিনীর গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব হামলার বিষয়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। সংবাদ আর্কাইভ পরিষেবা।

অন্য দিকে শনিবার অধিকৃত পশ্চিমতীরের নাবলুসের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুসরা এবং জালুদ গ্রামে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি দখলদাররা। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, হামলাকারীরা কুসরা শহরের পশ্চিমাঞ্চলে বাড়িঘরে প্রবেশের চেষ্টা করলে স্থানীয়দের সাথে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ‘দখলদাররা এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছে এবং কুসরা ও জালুদের মধ্যবর্তী পোলট্রি খামারগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।’ তবে এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

গত বছরের তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতির’ পর থেকে ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭১৩ জনে পৌঁছেছে এবং অন্তত এক হাজার ৯২৮ জন আহত হয়েছেন। ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনির মোট সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ২৯১ জনে দাঁড়িয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই নারী ও শিশু।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল প্রতিনিয়ত তা লঙ্ঘন করে আসছে। এ ছাড়া গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে পশ্চিমতীরেও ইসরাইলি অভিযান, হত্যা, গ্রেফতার ও অবৈধ বসতি স্থাপন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিলিস্তিনিরা এটা পশ্চিমতীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) এক যুগান্তকারী রায়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন এবং পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমের সব অবৈধ বসতি খালি করার আহ্বান জানিয়েছেন।

মৃত্যুদণ্ড আইনে দ্বৈত বিচারব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সমালোচনা তীব্র

ইসরাইলের পার্লামেন্টে পাস হওয়া নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। আইনটি ‘সন্ত্রাসবাদ দমনের’ নামে প্রণয়ন করা হলেও সমালোচকদের মতে, এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বৈষম্যমূলক ও দ্বৈত বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছে। খবর মিডলিস্ট মনিটর।

নতুন আইনে দখলকৃত পশ্চিমতীরে সামরিক আদালতগুলোকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, এমনকি প্রসিকিউশনের সুপারিশ ছাড়াও। ফাঁসির মাধ্যমে দণ্ড কার্যকর এবং দ্রুত বাস্তবায়নের বিধানও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই আইন কার্যত দু’টি পৃথক আইনি কাঠামো তৈরি করেছে- একটি ফিলিস্তিনিদের জন্য, অন্যটি ইসরাইলি নাগরিকদের জন্য। যেখানে ইসরাইলিরা বেসামরিক আদালতে তুলনামূলক কম কঠোর শাস্তি পায়, সেখানে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড সহজ করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক কর্মকর্তা বলেন, এই আইন বৈষম্যকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিকে ক্ষুণœ করবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও একে ‘নিষ্ঠুর ও মানবাধিকারবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেছেন, দখলকৃত অঞ্চলে এই আইন প্রয়োগ করা হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমতীরের সামরিক আদালতগুলোর দণ্ডাদেশের হার অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এই আইন অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি কারাগারে বন্দী রয়েছেন, যাদের অনেকেই বিচারবহির্ভূত অবস্থায় আটক। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই আইন ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর দমননীতির পথ খুলে দিতে পারে এবং এ অঞ্চলের সঙ্কটকে আরো গভীর করবে।

গাজামুখী ত্রাণবহরে ফেরার প্রস্তুতি, ঝুঁকি জেনেও এগোচ্ছেন অস্ট্রেলীয় কর্মীরা

গাজায় ত্রাণ পৌঁছাতে আবারো সমুদ্রপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে আন্তর্জাতিক কর্মীদের একটি বহর। ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগে অংশ নিতে যাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাতা জুলিয়েট ল্যামন্ট, যিনি আগের অভিযানে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

ল্যামন্ট জানান, গত অক্টোবর মাসে গাজার কাছাকাছি পৌঁছালে তাদের নৌযানটি ইসরাইলি নৌবাহিনী আটক করে। সে সময় তাকে ছয় দিন কারাগারে রাখা হয় এবং শারীরিক নির্যাতন, অপমান ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। ছয় মাস পর আবারো গাজার উদ্দেশে যাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি স্পেনের বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১০০টি নৌযান রওনা দেবে, যাতে প্রায় দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেবেন। তারা খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী ও সহায়তাকর্মী নিয়ে গাজায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। তবে এবারের যাত্রা আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন আয়োজকরা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক অংশগ্রহণকারী ঝুঁকি বিবেচনায় সরে দাঁড়ালেও অনেকে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছেন। ল্যামন্ট বলেন, ‘ভয় কাজ করছে; কিন্তু ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা ভেবে ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।’ সম্ভাব্য আটক বা নির্যাতনের আশঙ্কায় তিনি আগেই কিছু প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমনকি প্রয়োজনীয় ওষুধও কমিয়ে আনছেন। আয়োজকরা জানান, অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং প্রতিটি নৌযান কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সব ঝুঁকি সত্ত্বেও অংশগ্রহণকারীরা আশা করছেন, বড় আকারের এই বহর গাজায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে এবং অবরুদ্ধ অঞ্চলের মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে পারবে।