দেশে বাড়ছে হামের প্রকোপ হাসপাতালে শিশুদের ভিড়

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ক্রমেই বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। এ পর্যন্ত আক্রান্তদের অনেকেই সুস্থ হলেও কোনো কোনো স্থানে চিকিৎসার অপ্রতুলতার কারণে মৃত্যুও হচ্ছে। কেবল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে গত ১২ দিনে ভর্তি হওয়া ৫৬০ জন শিশুর মধ্যে ১০৬ জনই হামে আক্রান্ত। বাকিরা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার মতো রোগ নিয়ে এসেছে। এরই মধ্যে সেখানে পাঁচটি শিশু মারাও গেছে।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
সারা দেশে হাম আক্রান্ত শিশুর সংখা বাড়ছে। ছবিটি মহাখালী বক্ষ্মব্যাধি হাসপাতাল থেকে তোলা  : নয়া দিগন্ত
সারা দেশে হাম আক্রান্ত শিশুর সংখা বাড়ছে। ছবিটি মহাখালী বক্ষ্মব্যাধি হাসপাতাল থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ক্রমেই বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। এ পর্যন্ত আক্রান্তদের অনেকেই সুস্থ হলেও কোনো কোনো স্থানে চিকিৎসার অপ্রতুলতার কারণে মৃত্যুও হচ্ছে। কেবল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে গত ১২ দিনে ভর্তি হওয়া ৫৬০ জন শিশুর মধ্যে ১০৬ জনই হামে আক্রান্ত। বাকিরা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার মতো রোগ নিয়ে এসেছে। এরই মধ্যে সেখানে পাঁচটি শিশু মারাও গেছে। এ দিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ১৮ শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে হামে লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১২ শিশু রোগীকে পৃথক একটি কর্নারে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে এক শিশুর হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর খবর দিয়েছেন। রাজধানী ঢাকাতেও হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ খাতে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার কথাও জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তা থেকে আগামী জুলাই-আগস্টে হামের জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেয়া হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, গত আট বছর ভাইরাসজনিত এই রোগটির বিরুদ্ধে শিশুদের বিশেষ ক্যাম্পেইনে কোনো টিকা দেয়া হয়নি। চিকিৎসকরা বলেছেন, মূলত অপুষ্টি এবং শিশুদের পর্যাপ্ত বুকের দুধ পান না করানো, কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়ানো এবং সর্বোপরি সময় মতো হামের টিকা না দেয়ার কারণে শিশুরা এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে।

চলতি বছরের গত জানুয়ারি থেকেই শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন। বিশেষ করে, ঢাকার কিছু বস্তি ও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশুদের মধ্যে হাম দেখা দিতে শুরু করে। চট্টগ্রামে ভর্তি হওয়া শিশুদেরও বেশির ভাগ কক্সবাজার থেকে আসা।

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত প্রচুর শিশু ভর্তি হচ্ছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জরুরি ভিত্তিতে ওই হাসপাতালে আইসিইউর সাথে ভেন্টিলেটর সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। কারণ, অনেক সময় হামে আক্রান্ত শিশুদের ভেন্টিলেটর প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালেও হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা: শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, হামের টিকার জন্য গ্যাভির সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তারা দুই কোটি সিরিঞ্জ দেবে। হামের ভ্যাকসিনও আছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পালন করা হবে। তিনি বলেন, সাধারণত শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হলে হামের টিকা দেয়া হয়। এবার দেখা যাচ্ছে, ৯ বয়সের চেয়ে কম বয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের নিয়মিত টিকা দেয়ার পরও চার বছর পরপর বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করার নিয়ম রয়েছে। তবে ২০২০ সালে এবং ২০২৪ সালে এই কাজটি করা হয়নি। বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হলে হয়তো অনেক শিশু বেঁচে যেত।

হাম হলে শিশুদের জ্বর হয়, কফ হয়, চোখ লাল হয়ে যেতে পারে, পুরো শরীরে র‌্যাশ উঠতে পারে। তা থেকে নিউমোনিয়া ও ব্রেইন ফুলে যেতে পারে। এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তবে লক্ষণ দেখে চিকিৎসা দিলে শিশুরা সুস্থ হয়ে উঠে। রোগটি খুবই ছোঁয়াচে।

ময়মনসিংহে ১২ দিনে ১০৬ শিশু শনাক্ত, মৃত্যু ৫

ময়মনসিংহ অফিস জানায়, মমেক হাসপাতালে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ময়মনসিংহের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও আক্রান্ত শিশুদেরকে চিকিৎসার জন্য আনা হচ্ছে এ হাসপাতালে। গত ১২ দিনে ১০৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ শনিবার রাতে মারা যাওয়া দুই শিশু হলোÑ ময়মনসিংহ সদরের চরগুবদিয়া এলাকার আব্দুর রহিমের ছেলে লিয়ন (বয়স ৭ মাস) ও কলমাকান্দা উপজেলার সারারকোনা গ্রামের আয়নাল হোসেনের ছেলে নূর নবী (বয়স ৬ মাস)।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিশু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা: গোলাম মওলার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

চমেক হাসপাতালে পৃথক কর্নার

চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ১৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১২ শিশুকে পৃথক একটি কর্নারে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এদের এক শিশুর হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। ভর্তি হওয়া শিশু রোগীদের বেশির ভাগই কক্সবাজারের বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: জাহাঙ্গীর আলম নয়া দিগন্তকে জানান, চমেক হাসপাতালে একজনের নিশ্চিত এবং ১১ জন সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে দুইজন এবং মা ও শিশু হাসপাতালে চারজন সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি আছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়।

রাজশাহী বিভাগে ছড়িয়ে পড়ছে হাম

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী বিভাগে শিশুদের মধ্যে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ ‘হাম’ ছড়িয়ে পড়ছে। গতকার পর্যন্ত এ বিভাগে ৭৭টি শিশু হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতর। তারা বর্তমানে বিভাগের ৮ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এদিকে হামে আক্রান্ত ২৮ শিশু রামেকে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা: মো: হাবিবুর রহমান জানান, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে বিভাগের হাসপাতালগুলোতে শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। পরে ১৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫৩ জনের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে। এতে ৪৪ জনের পজিটিভ রিপোর্ট আসে। ছোঁয়াচে এ রোগ শনাক্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা: শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, রোববার পর্যন্ত ২৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদেরকে আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থায় রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সাথে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। এ ছাড়া গুরুতর অসুস্থ কোনো কোনো শিশুকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।