৪ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু আজ

মোবাইল কোর্টের পরিধি বাড়াতে চান ডিসিরা

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর তফসিলের ক্রমিক নং ১-৫ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত করার প্রস্তাব করবেন বরগুনার জেলা প্রশাসক। প্রস্তাবের পক্ষে তার যুক্তি, ভেজাল ও মানহীন ওষুধ-কসমেটিকসের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে। দীর্ঘসূত্রিতা কমে গিয়ে অপরাধ দমনে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা জোরদার হবে এবং বাজারে নিরাপদ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত হবে। জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রথম দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ সম্পর্কিত বিষয়াবলি শীর্ষক আলোচনায় তিনি এই প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন।

বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮ মোবাইল কোর্টের তফসিলভুক্ত করার প্রস্তাব দেবেন নীলফামারীর জেলা প্রশাসক। প্রস্তাবের পক্ষে এই কর্মকর্তার যুক্তি হলো, ভেজাল ও অবৈধ বালাইনাশক দ্রুত দমন করা সম্ভব হবে। মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে। কৃষক ও ভোক্তার স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার হবে। প্রস্তাবটি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের তৃতীয় অধিবেশনে মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিষয়াবলিতে উপস্থাপন করা হবে।

নাগরিক সমাজের মতে, আইনি প্রেক্ষাপট ও সেবার মানসিকতা ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে তাৎক্ষণিকভাবে বিচারিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে বাস্তবতা হলো, আমাদের আমলাতন্ত্রে অনেকসময় সেবার চেয়ে ‘প্রভুত্বের’ মনোভাব বেশি ফুটে ওঠে। সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় জনগণের সেবকের পরিবর্তে নিজেদের অধিপতি ভাবতে শুরু করেন। দুনিয়াজুড়ে সরকারি কর্মচারীরা জনগণের সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করলেও, আমাদের এখানে অনেকসময় তারা ধরে নেন জনগণ হলো তাদের অধীনস্থ। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে প্রকৃত জনকল্যাণ নিশ্চিত করা অসম্ভব।

কুড়িগ্রাম থেকে জামালপুরে মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্টকে ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ জনমনে আস্থার সঙ্কট তৈরি করে। কুড়িগ্রামের সেই আলোচিত ঘটনা, যেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে মধ্যরাতে এক সাংবাদিককে ঘর থেকে তুলে এনে তাৎক্ষণিক সাজা দেয়া হয়েছিল। এখানে বড় প্রশ্নটি ছিল মানবাধিকারের; যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে দণ্ডিত করা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ রোববার । সকাল সাড়ে ১০টায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ৪৯৮টি প্রস্তাব উত্থাপিত হবে।গতকাল শনিবার সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: হুমায়ুন কবির এ তথ্য জানান। এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি উপস্থিত ছিলেন।

মো: হুমায়ুন কবির বলেন, এবারের সম্মেলন ৩ থেকে ৬ মে পর্যন্ত চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে; গত সম্মেলন ছিল তিন দিনব্যাপী। সম্মেলনের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো- ভূমি ব্যবস্থাপনা; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদার করা; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম; স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন; সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্ন্যান্স; শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সম্প্রসারণ; স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ; পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ; ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়।

সম্মেলন চলাকালে কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ, নির্দেশনা গ্রহণ ও মতবিনিময় করবেন বলে জানান তিনি। অতিরিক্ত সচিব বলেন, এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারবৃন্দ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সাথে কার্য-অধিবেশন রয়েছে।

তিনি জানান, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মোট ৩৪টি অধিবেশন ও কার্য-অধিবেশন হবে। এর মধ্যে কার্য-অধিবেশন ৩০টি; উদ্বোধন অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও সদয় নির্দেশনা গ্রহণসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা তিনটি এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে মুক্ত আলোচনা ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা একটি।

অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৯৮টি প্রস্তাব কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব প্রস্তাবে জনসেবা ও স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি, জনদুর্ভোগ হ্রাস করা, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, পর্যটনের বিকাশ, আইন-কানুন বা বিধিমালা সংশোধন এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৪৪টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, আজ ৩ মে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নির্দেশনা গ্রহণ, ৪ মে জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নির্দেশনা গ্রহণ এবং ৫ মে সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নির্দেশনা গ্রহণের সূচি রয়েছে।

সম্মেলনের প্রত্যাশিত ফলাফলের বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে জেলা প্রশাসকরা যে আইনগত, প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন এবং স্ব স্ব জেলায় বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করেন, এসব বিষয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী, সিনিয়র সচিব ও সচিবদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর পন্থা নির্ধারণ এবং সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর কৌশল প্রণয়ন করা হবে।

তিনি আরো বলেন, এ ছাড়া মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোর অনুসৃত নীতি-কৌশল, গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জেলা প্রশাসকরা সম্যক ধারণা লাভ করবেন। একই সাথে পর্যটন খাতের বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর বৃদ্ধি, সরকারের নীতি ও কর্মসূচির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হবে। সম্মেলন শেষ হবে ৬ মে বুধবার।