ত্রাণের বদলে ইসরাইলি বাহিনীর গুলি, প্রাণ গেল ৭১ ফিলিস্তিনির

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলো যেন মৃত্যুর ফাঁদ
  • যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান ইসরাইলের বিরোধী নেতার
  • গাজায় যুদ্ধবিরতির ‘সময় এসে গেছে’: জার্মান চ্যান্সেলর

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে একটি বিতরণ স্থানের কাছে ইসরাইলি বাহিনী ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা ৫০ জনের বেশি লোককে হত্যা করেছে, যা ত্রাণপ্রার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর সর্বশেষ মারাত্মক ঘটনা। বেসামরিক প্রতিরক্ষা মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল এএফপিকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভোরে গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলে ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। গুলি ও ট্যাংকের গোলা দিয়ে ইসরাইলি দখলদার বাহিনী ৫০ জনকে হত্যা এবং প্রায় ১৫০ জনকে আহত করেছে। মন্তব্যের জন্য এএফপি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু সাড়া পায়নি। মঙ্গলবার ছিটমহলজুড়ে বিতরণ স্থানে ফিলিস্তিনিরা যখন সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিল, তখন সহিংসতা চালানো হয়, ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মোট ৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হতে পারে, যদিও সংখ্যাটি এখনো যাচাই করা হয়নি। গাজার হাসপাতাল সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে যে ভোর থেকে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ইসরাইলি গুলিতে ৫০ জন নিহত হয়েছেন এবং সমগ্র অঞ্চলজুড়ে আরো ২১ জন নিহত হয়েছেন।

সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অনুসারে, মধ্য গাজার ওয়াদি গাজার দক্ষিণে সালাহুদ্দিন স্ট্রিটে এক ঘটনায় কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হয়েছেন বলে মেডিক্যাল সূত্র জানিয়েছে। আরো ১৪০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬২ জনের অবস্থা গুরুতর। গত মাসের শেষের দিকে বিতর্কিত ইসরাইলি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে প্রতিদিনের হত্যাকাণ্ডের এটি সবশেষ ঘটনা। জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউ)-এর প্রধান এই ঘটনাকে ‘মৃত্যুর ফাঁদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাইট ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এবং আলজাজিরার সানাদ এজেন্সি দ্বারা যাচাই করা ফুটেজে দেখা গেছে যে লাশগুলো নিকটবর্তী নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরের আল-আওদা হাসপাতালে আনা হচ্ছে।

দীর্ঘ এক বছর আট মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইলের লাগাতার ও ভয়াবহ হামলায় গাজা উপত্যকা আজ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অবরুদ্ধ এই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬ হাজারের বেশি মানুষ। শিশুদের দেহ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে বোমার আঘাতে, একাধিক পরিবারের সদস্যরা একসাথে মাটিচাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল কোনো কিছুই রেহাই পায়নি। হামলার শুরু থেকেই ইসরাইল গাজায় খাবার, পানি ও জ্বালানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে মানবিক সহায়তার প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়। ধ্বংস করে দেয়া হয় কৃষিজমি। গাজার সাধারণ মানুষকে জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যক সব উপকরণ থেকে বঞ্চিত করে সৃষ্টি করা হয় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি।

‘ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলো যেন মৃত্যুর ফাঁদ’

গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন খাদ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ বিতরণের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সাহায্যপ্রার্থীদের হত্যা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইল দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে গাজায় সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়ার পর ব্যাপক দুর্ভিক্ষের সতর্কতা জারি করার হয়। এর ফলে ফাউন্ডেশনটি মে মাসের শেষের দিকে তাদের সাহায্য বিতরণ কর্মসূচি শুরু করে। জাতিসঙ্ঘ জিএইচএফের সাথে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে যে এটি মানবিক চাহিদার চেয়ে ইসরাইলি সামরিক লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেয় এবং সাহায্যের ‘অস্ত্রীকরণ’ করছে বলে এর নিন্দা জানিয়েছে। জিএইচএফ বিতরণ কেন্দ্রগুলো বিশৃঙ্খলা ও হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যে জর্জরিত। জিএইচএফের সাহায্য বিতরণ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি সৈন্যদের দ্বারা ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং এক হাজার জন আহত হয়েছে।

ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসঙ্ঘের সংস্থার প্রধান ফিলিপ লারিজানি মঙ্গলবার বলেছেন যে গাজায় সাহায্য বিতরণের ব্যবস্থাটি জঘন্য। নতুন তৈরি তথাকথিত সাহায্য ব্যবস্থা এমন একটি জঘন্য কাজ করছে যা মানুষকে অপমানিত ও অবমাননা করে। বার্লিনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, এটি একটি মৃত্যু ফাঁদ যা জীবন বাঁচানোর চেয়ে বেশি জীবন কেড়ে নিচ্ছে।’

সোমবার প্রকাশিত একটি চিঠিতে, আন্তর্জাতিক বিচারক কমিশন বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিচারকদের একটি মানবাধিকার এনজিও-জিএইচএফের নিন্দা জানিয়ে ‘গাজায় বেসরকারি সামরিকীকরণকৃত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছে। জেনেভাভিত্তিক এনজিও ট্রায়াল ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ গ্রান্ট বলেছেন যে জিএইচএফের সাহায্য বিতরণের মডেল ‘মূল মানবিক নীতি লঙ্ঘন করে’।

তিনি আরো বলেন, যারা জিএইচএফের কাজকে সক্ষম করেছেন বা লাভবান হয়েছেন তারা ‘যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার জন্য বিচারের প্রকৃত ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের জোরপূর্বক স্থানান্তর, যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে বেসামরিক নাগরিকদের অনাহার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, দখলদার ইসরাইল গাজায় বেসামরিক মানুষদের অনাহারে ফেলে রাখাকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ত্রাণের আশায় জড়ো হওয়া দুর্বল ও ক্ষুধার্ত মানুষদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বারবার। দুই মাসের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, গত ২ মার্চ থেকে ইসরাইল গাজায় সব ধরনের ত্রাণ প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে প্রায় তিন মাস পর মে মাসের শেষ দিকে সীমিত আকারে কিছু ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেয় ইসরাইল। তবে জাতিসঙ্ঘ বা আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে তৈরি করা হয় গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) নামের একটি নতুন সংগঠন, যার মাধ্যমেই অল্প কিছু জায়গায় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।

জিএইচএফের এসব বিতরণকেন্দ্রেই এখন প্রায় প্রতিদিনই ত্রাণ নিতে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালাচ্ছে ইসরাইলি সেনারা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে, গাজার এসব বিতরণকেন্দ্রে ক্ষুধার্ত হাজার হাজার মানুষ ত্রাণের আশায় জড়ো হন; কিন্তু সেখানে সরাসরি ইসরাইলি বাহিনীর গুলি বর্ষণে মৃত্যু হয় বহু ফিলিস্তিনির। গাজার গণমাধ্যম কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত শুধু জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলোতেই ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন চার শতাধিক ফিলিস্তিনি, আহত হয়েছেন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন। এই বর্বরতা বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা কুড়ালেও, নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ।

গাজাতেও যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান ইসরাইলের বিরোধী নেতার

ইরানের সাথে ইসরাইলের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর গাজায় ২০ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলি বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স প্ল্যাটফর্মে তিনি লিখেছেন, আর এখন গাজা। সেখানেও যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে। জিম্মিদের ফিরিয়ে দাও, যুদ্ধ শেষ করো! সূত্র : বিবিসি ও আলজাজিরা। মধ্য-বাম ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধ শেষ করুন এবং ইসরাইলকে দুর্বল, বিভক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ করার হুমকি দেয় এমন অভ্যুত্থান চিরতরে বন্ধ করুন।’ এর আগে, মঙ্গলবার সকালে ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার আগে ইসরাইলে বেশ কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে ইরান।

গাজায় যুদ্ধবিরতির ‘সময় এসে গেছে’: জার্মান চ্যান্সেলর

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ বলেছেন, গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের অবসান ঘটানো উচিত। মঙ্গলবার পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিতে গিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে অবস্থিত ছিটমহলে যুদ্ধবিরতির ‘সময় এসে গেছে’। যদিও মের্জ উল্লেখ করেছেন যে ইসরাইলের ‘তার অস্তিত্ব এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষা করার অধিকার আছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে ‘গাজা উপত্যকায় ইসরাইল কী অর্জন করতে চায় সে সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে জার্মানির। মের্জ ইসরাইলকে ‘গাজা উপত্যকার মানুষদের, বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বয়স্কদের প্রতি মানবিক আচরণ’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।