মো: লোকমান হেকিম
ইসলামে আত্মহত্যা মহাপাপ ও ঘৃণ্য কাজ। মানুষ কেন আত্মহত্যা করে সে বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা যাক। আত্মহত্যার অনেক কারণ আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য, যৌতুকের কারণে ঝগড়া-বিবাদ, পিতা-মাতা ও ছেলেমেয়ের মধ্যে মনোমালিন্য, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে মুক্তি, প্রেম-বিরহ, মিথ্যা অভিনয়ের ফাঁদে পড়ে কিংবা ব্যবসায়ে ব্যর্থতা। যখন জ্ঞান-বুদ্ধি, উপলব্ধি ও অনুধাবন শক্তি লোভ পায়, নিজেকে অসহায় ও ভরসাহীন মনে হয়; তখনই মানুষ আত্মহত্যা করে বসে। আত্মহত্যার পরিণতি সম্পর্কে কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- আর তোমরা নিজেরা নিজদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু। আর যে কেউ সীমালঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে তা করবে, অবশ্যই আমরা তাকে আগুনে পোড়াব; এসব আল্লাহর পক্ষে সহজ। (সূরা নিসা : ২৯-৩০) আত্মহত্যার ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ওইভাবে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করে, সে-ও জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ওইভাবে নিজ হাতে বিষপান করতে থাকবে। আর যে কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করে, তার কাছে জাহান্নামে সেই ধারালো অস্ত্র থাকবে, যা দিয়ে সে সর্বদা নিজের পেট ফুঁড়তে থাকবে।’ (বুখারি ও মুসলিম) আত্মহত্যার প্রতিফল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের এক ব্যক্তি আহত হয়ে সে ব্যথা সহ্য করতে পারেনি। সে একটি ছুরি দিয়ে নিজের হাত নিজেই কেটে ফেলে। এরপর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়। এ ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-‘আমার বান্দা নিজেকে হত্যা করার ব্যাপারে বড় তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে। আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আত্মহত্যা তো দূরের কথা মৃত্যু কামনাও করা যাবে না। মৃত্যু যদি প্রত্যাশা করতেই হয় তবে সে যেন বলে, হে আমার রব আমাকে সে অবধি জীবিত রাখুন, যতক্ষণ আমার জীবনটা হয় আমার জন্য কল্যাণকর। আর আমাকে তখনই মৃত্যু দিন যখন মৃত্যু হয় আমার জন্য শ্রেয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)
আত্মহত্যা থেকে বাঁচাতে পরিবার, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা, ইসলামিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতা ইত্যাদি উপায়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে সব শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যা না করার ব্যাপারে সচেতনতা কিংবা আত্মহত্যা সমাধানের পথ নয়- এ ব্যাপারে শিক্ষা দিতে হবে। প্রত্যেক পিতা-মাতার উচিত তাদের সন্তানদের কুরআন-হাদিসের জ্ঞান শিখিয়ে তারপর অন্য কিছু শিক্ষা দেয়া।
প্রতি মুহূর্তে ধৈর্য ধরতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন এবং অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, জান-মালের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ (সূরা বাকারা : ১৫৩-১৫৫)
মোট কথা, যখনই নিজেকে অসহায় ও আশাহত মনে হয় এবং আত্মহত্যার চিন্তা আসে, তখনই পরিবারের সদস্যদের মনে করতে হবে। পাশাপাশি ইসলামে আত্মহত্যা নাজায়েজ এবং এর পরিণাম জাহান্নাম- এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে। সাথে সাথে মনে রাখতে হবে, আল্লাহ আমার প্রধান সহায়। তিনি সব সমস্যার মুক্তিদাতা। তা ছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। কোনো সমস্যা সমাধানের পথ আত্মহত্যা নয়; বরং ইসলাম ও সামাজিক দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং জঘন্য অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ থেকে আমাদের সবাইকে অবশ্যই দূরে থাকা উচিত।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট



