বিপুল পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে সমাপ্ত লবণ উৎপাদন মৌসুম

Printed Edition

এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

বিপুল পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে সমাপ্ত হলো দেশের লবণ উৎপাদন মৌসুম (২০২৫-২০২৬)। চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৪ মেট্রিক টন। উৎপাদন ঘাটতি রয়েছে সাত লাখ ৭০ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন।

গত মৌসুমে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। গতকাল পর্যন্ত মাঠে পাইকারি প্রতিমন লবণের মূল্য ছিল ৩৩৫ টাকা গত মৌসুমে একই সময়ে পাইকারি প্রতিমন লবন বিক্রি হয়েছিল ২৭০ টাকা।

বিপুল পরিমাণ লবন উৎপাদন ঘাটতি নিয়ে উৎপাদন মৌসুম সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে গতকাল রোববার বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার আবু জাফর ভূঁইয়া বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৫ মে থেকে চাষিরা লবণ মাঠ ছেড়ে দেয়ায় ওই দিন থেকে চলতি মৌসুমের লবণ উৎপাদন মৌসুম সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তিনি বলেন, গতকাল পর্যন্ত মাঠে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ ও মিলারদের কাছে আরো এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনসহ ১১ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর লবণ মাঠে এবার ৪০ হাজার ১৫০ জন চাষি লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত ছিল। তবে উৎপাদন মৌসুম শুরু থেকে প্রায় শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে হয়েছে গড়ে ১০০ টাকা থেকে ১৩০ টাকার উৎপাদন মূল্যের ঘাটতি নিয়ে। এতে লবণ উৎপাদন করে বছরজুড়ে চাষিরা লোকশান গুণে গেলেন।

জানা গেছে, দেশে শিল্প কারখানায় ব্যবহার হচ্ছে কসটিক সোডা ও বিভিন্ন ধরনের ক্যামিকেল যা দেশে তৈরি লবণ দিয়ে তৈরি করা হয়। কসটিক সোডার জন্য প্রয়োজন হয় সোডিয়াম সালফেট। অন্যান্য ক্যামিকেল তৈরি করতে প্রয়োজন হয় উন্নত মানের সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্য লবণ)। দেশের উৎপাদিত সোডিয়াম ক্লোরাইড দিয়ে গুণগতমান ভালো না হওয়া ক্যামিকেল তৈরিতে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি দেখা দেয়।

এদিকে দেশে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কসটিক সোডা ও বিভিন্ন রাসায়নিক উৎপাদনের জন্য সোডিয়াম সালফেট ও উন্নতমানের সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগের অপব্যবহার করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করা হচ্ছে। এসব আমদানিকৃত লবণ পরোক্ষভাবে বাজারে চলে আসায় দেশীয় উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

গত মৌসুম থেকে চলতি মৌসুমজুড়ে অব্যাহতভাবে উৎপাদিত লবণের অস্বাভাবিক দর পতন হওয়ার কারণে লবণ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন চাষিরা। ফলে চলতি মৌসুমে সময় মত লবণ উৎপাদনে অধিকাংশ চাষি মাঠে নামেনি। লবণ নীতিমালা-২২ এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া ও উৎপাদিত লবণের পাইকারী ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না করা এবং বিদেশ থেকে শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত ক্যামিকেল তৈরির জন্য সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি বা সঠিক তদারকি না থাকার সুযোগে আমদানিকারকরা অতিরিক্ত লাখ লাখ টন উন্নতমানের সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি ও বাজারজাত করছেন। যার কারণে মাঠে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লবণ চাষিরা।

গত মৌসুমে (২০২৪-২৫) বিপুল পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে লবণ উৎপাদন মৌসুম শেষ হয় (ঘাটতি তিন লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন লবণ)। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দেখা দিলে সব ধরনের পণ্যের মূল্য স্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেও উৎপাদিত লবণের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত। লবণের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া দূরের কথা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় বছরজুড়ে চাষিরা গড়ে প্রতিমনে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা লোকসান গোনেন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার চাষিরা অবিলম্বে লবণ নীতিমালা বাস্তবায়ন ও মাঠে উৎপাদিত লবণের পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, গত ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। দেশের সমস্ত লবণ উৎপাদন হয় চট্টগ্রামের বাঁশখালী আনোয়ারা পটিয়া উপজেলা কক্সবাজার জেলায়।

জানা গেছে, দেশে শিল্প কারখানায় সোডিয়াম সালফেট প্রয়োজন রয়েছে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ মেট্রিক টন। যা দেশে উৎপাদন হয় না। অপর দিকে শিল্পকারখানায় সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্যলবণ) প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার হয়। বিশেষ করে সোডিয়াম ক্লোরাইড থেকে শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ক্যামিকেল তৈরি করা হয়। যা দেশে উৎপাদিত লবণ থেকে ওই ক্যামিকেল উৎপাদন করতে হলে লবণের ঘাটতি বেশি হয়। এসব কারণে সরকার সোডিয়াম সালফেট ও বিদেশে উৎপাদিত সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির সুযোগ দেন। আর ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমাদানিকারকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাখ লাখ মেট্রিক টন সোডিয়াম ক্লোরাইড আমাদানি ও বাজারজাত করেন। যার কারণে লবণ উৎপাদনে ঘাটতি হলেও বিপুল পরিমাণ লবণ মজুদ থাকায় চাষিরা পাইকারি লবণ বিক্রি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে।