বিবিসি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ঘোষিত ১০ শতাংশ হারে বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক কার্যকর করেছেন। এর আগে গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট তার আরোপিত পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। রায় প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। পরে তিনি শুল্কহার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার হুমকি দিলেও তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করেননি। ফলে আপাতত ১০ শতাংশ হারেই শুল্ক কার্যকর হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই শুল্ক আরোপ করছে। এই ধারায় কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রয়েছে প্রেসিডেন্টের। বিনিয়োগ ব্যাংক আইএনজি গ্রুপের বিশ্লেষক কারস্টেন ব্রজেস্কি মনে করেন, ঘন ঘন শুল্কহার পরিবর্তন ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারেরা পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে, ফলে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকি বেড়েছে।
নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প বলেন, অস্থায়ী আমদানি শুল্কের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং মার্কিন কৃষক, শ্রমিক ও উৎপাদকদের স্বার্থ সুরক্ষা। তবে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর যুক্তি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
এর আগে ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় (আইইইপিএ) ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট-৬৩ সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে জানায়, ওই আইনের আওতায় বৈশ্বিক শুল্ক আরোপে প্রেসিডেন্ট ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। রায়ের পর ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত মার্কিন স্বার্থবিরোধী। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যেসব দেশ বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে টালবাহানা করবে, তাদের ওপর আরো বেশি হারে শুল্ক আরোপ করা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, গ্রীষ্মে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তির অনুমোদন আপাতত স্থগিত রাখা হবে। পরিস্থিতি অবনতি হলে তারা পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্য দিকে ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নির্ধারিত বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের রায় ও নতুন শুল্ক কার্যকরের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে।
বাণিজ্যচুক্তিতে চালবাজি করলে বাড়তি শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের
এদিকে বিবিসি জানায়, বিশ্বজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা বিপুল অঙ্কের শুল্কের বড় অংশ গত সপ্তাহে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আটকে দেয়ার পর নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যেসব দেশ সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে চালবাজি বা টালবাহানা করবে, তাদের ওপর আরো বেশি হারে শুল্ক আরোপ করা হবে।
ট্রাম্পের এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায়ের পর বিভিন্ন দেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের করা বাণিজ্যচুক্তি ও শুল্কের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করছে, ঠিক তখন ট্রাম্পের এ হুঁশিয়ারি এলো। গত বছর ট্রাম্পের আরোপিত বেশির ভাগ শুল্কই ওই রায়ে বাতিল হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গ্রীষ্মে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্য দিকে ভারতও একটি সাম্প্রতিক চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য নির্ধারিত আলোচনা পিছিয়ে দিয়েছে।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোস্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন, আদালতের রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কেউ যেন আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে না আসে। তিনি লেখেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের হাস্যকর রায় নিয়ে যেসব দেশ চালবাজি করতে চায়, বিশেষ করে যারা বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘লুট’ করেছে, তাদের আরও চড়া শুল্কের মুখে পড়তে হবে। সম্প্রতি তারা যে শুল্কে রাজি হয়েছিল, পরিস্থিতি তার চেয়ে খারাপ হবে। ক্রেতা সাবধান!’ এই পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি মূলত গত শুক্রবারের আদালতের রায়ের পর তৈরি হওয়া চরম বিশৃঙ্খলারই বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) ব্যবহার করে গত বসন্তে ট্রাম্প যেসব পাল্টা শুল্ক বসিয়েছিলেন, আদালত তা বাতিল করে দেন। আদালত বলেন, এই আইন প্রেসিডেন্টকে এমন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না।


