জাকাত ও ফিতরার নিসাব : কতটুকু দিতে হবে?

Printed Edition

হাফেজ মাও: মো: সোলায়মান হাওলাদার ও সৈয়দ রবিউস সামস

জাকাত ও ফিতরা দেয়ার পরিমাণ কতটুকু আসুন কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক আমরা জেনে নিই। গত ৪ মার্চ ২০২৫ তারিখে জাকাত ও ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করে ফতোয়া জারি করেছে জামি’আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। মাদরাসাটির ফতোয়া বিভাগের পক্ষ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির লেটারহেড প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বর্তমান স্বর্ণ ও রুপার বাজারমূল্য অনুযায়ী জাকাত ও ফিতরার হিসাব দেয়া হয়েছে...

ইসলামে জাকাত ও ফিতরা গরিবদের অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জাকাত ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ ও নির্ধারিত ফরজ ইবাদত, যা এমন সামর্থ্যবান বা বিত্তশালীদের জন্য ফরজ যাদের নেসাব মতো সম্পদ রয়েছে। অপর দিকে সদকাতুল ফিতর (ফিতরের জাকাত) হলো ঈদুল ফিতরের (রমজানের ঈদ) আগে গরিবদের সহায়তা করার জন্য নির্ধারিত ওয়াজিব সদকাহ বা দান, যাতে তারা ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। উভয় আমলই সমাজের সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা দেয়। এই বিধান ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য নিরসনে ইসলামের অনবদ্য কীর্তি, যা আল-কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত।

কুরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘ওয়াকিমুস সালাতা ওয়াতুজ জাকাতা’ অর্থাৎ ‘তোমরা সালাত কায়েম করো ও জাকাত আদায় করো। (আল-বাকরাহ : ৪৩, ৮৩, ১১০) অন্য দিকে, সহিহ বুখারির এক হাদিসে এসেছে : আবু হুরায়রাহ্ (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে ঐ ধন-সম্পদের জাকাত আদায় করেনি, সে ধন-সম্পদকে কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন টাকমাথা সাপে পরিণত হবে। এ সাপের দু’চোখের উপর দু’টি কালো দাগ থাকবে (অর্থাৎ বিষাক্ত সাপ)। এরপর ওই সাপ গলার মালা হয়ে ব্যক্তির দু’চোয়াল আঁকড়ে ধরে বলবে, আমিই তোমার সম্পদ, আমি তোমার সংরক্ষিত ধন-সম্পদ। (সহিহ বুখারি ১৪০৩)

ইবনে উমার (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : প্রত্যেক গোলাম, আজাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্তবয়স্ক, অপ্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল ফিতর হিসেবে খেজুর হোক অথবা জব হোক এক সা’ পরিমাণ আদায় করা ফরজ করেছেন এবং লোকজনের ঈদের সালাতে বের হওয়ার আগেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি-১৫০৩)

এখন চলছে বরকতময় রমজান মাস। সংযমের এই মাসে বেশি বেশি দান-সদকা করার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সা: উৎসাহ দিয়েছেন। এই কারণে অনেকে রমজান মাসে জাকাত দিয়ে থাকেন যদিও বছরের যেকোনো সময়ে জাকাত দেয়া যায় জাকাতদাতার সম্পদ এক বছর পূর্ণ হলেই। তবে ফিতরা দিতে হবে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই।

এখন জাকাত ও ফিতরা দেয়ার পরিমাণ কতটুকু আসুন কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক আমরা জেনে নিই। গত ৪ মার্চ ২০২৫ তারিখে জাকাত ও ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করে ফতোয়া জারি করেছে জামি’আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। মাদরাসাটির ফতোয়া বিভাগের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির লেটারহেড প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বর্তমান স্বর্ণ ও রুপার বাজারমূল্য অনুযায়ী জাকাত ও ফিতরার হিসাব দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জামি’আ রহমানিয়া আরাবিয়ার নায়েবে মুফতি সাঈদ আহমাদ এবং প্রধান মুফতি মনসুরুল হক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলতি বছর জাকাতের নিসাব ৫২.৫ তোলা রুপার মূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ৯৫ হাজার টাকা।

অর্থাৎ যদি কারো কাছে নিজ প্রয়োজনীয় ব্যবহারিত সম্পদ ছাড়া ৭.৫০ ভরি স্বর্ণ বা ৫২.৫০ ভরি রুপা থকে বা এর সমপরিমাণ সম্পদ থাকে এবং তাতে এক বছর পর্যন্ত কোনো হ্রাস না হয়; বরং বৃদ্ধি পায় বা একই অবস্থায় বহাল থাকে তবে তাকে জাকাত ২.৫% হারে জাকাত প্রদান করতে হবে।

ফিতরার হিসাব

রমজানের ঈদের আগে ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। ফিতরা হিসাব করার জন্য প্রধানত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ও বাজারমূল্য বিবেচনা করা হয়।

সাধারণত ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরা প্রদান করতে পারেন। তবে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা ফিতরা দেয়া বাধ্যতামূলক। ধনী মুসলিমরা চাইলে উন্নত মানের খাদ্যশস্যের বাজারমূল্য অনুযায়ী বেশি পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ফিতরার পরিমাণ দুই হাজার ৭০০ টাকা।

তবে মঙ্গলবার (১১ মার্চ) বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির সভায় ১৪৪৬ হিজরি সনের রমজানে এ বছর ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা ও সর্বোচ্চ দুই হাজার ৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিই শিরোধার্য।

জাকাত ও ফিতরা প্রদানকারীদের করণীয় : সম্ভাব্য দরিদ্রদের খুঁজে বের করা : জাকাত ও ফিতরা প্রদানের জন্য প্রকৃত অভাবী ও দরিদ্রদের চিহ্নিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে নিজের দরিদ্র আত্মীয়দের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিশ্বাসযোগ্য সংস্থার মাধ্যমে বিতরণ : অনেক মানুষ নির্ভরযোগ্য সংস্থার মাধ্যমে জাকাত ও ফিতরা প্রদান করে থাকেন, যা সুবিধাজনক হতে পারে।

সঠিক নিয়ম অনুসরণ : ইসলামিক বিধান অনুযায়ী জাকাত ও ফিতরা প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

মনে রাখতে হবে, জাকাত ও ফিতরা প্রদান শুধু ইবাদত নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও। অনেকসময় দেখা যায়, মানুষ এই বিষয়টিকে অবহেলা করে বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করে। তাই জাকাত প্রদানের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে হিসাব করে নেয়া জরুরি। একইভাবে ফিতরার ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিমাণের কম দেয়া বা বিলম্ব করা উচিত নয়।

জাকাত ও ফিতরা প্রদান করার উপায় : বর্তমানে বিভিন্ন ইসলামী সংস্থা ও মসজিদের মাধ্যমে জাকাত ও ফিতরা প্রদান করা যায়। এ ছাড়া প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগেও নিকটস্থ দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে পারেন। এটা ইচ্ছাধীন।

রমজান একটি আত্মশুদ্ধির মাস, যেখানে দান-সদকার গুরুত্ব অপরিসীম। যারা জাকাত প্রদান করবেন, তারা যেন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে হিসাব করে তা প্রদান করেন। একইভাবে ফিতরা যেন ঈদের নামাজের আগে প্রদান করা হয়, যাতে দরিদ্ররাও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারেন।

আধুনিক যুগে জাকাত ও ফিতরার ব্যবহার : বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জাকাত ও ফিতরা বিতরণের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা ও ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণে ভূমিকা রাখছে। দাতা ব্যক্তিরা চাইলে মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংস্থায় জাকাত-ফিতরা প্রদান করতে পারেন। এতে অর্থ সহজেই সঠিক জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।

আসুন, আমরা সবাই সঠিক নিয়ম মেনে জাকাত ও ফিতরা প্রদান করি এবং আমাদের সমাজে সহমর্মিতা ও মানবিকতা বজায় রাখি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে জাকাত ও ফিতরার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দান করুন এবং সুন্নাহ মোতাবেক তা আদায় করবার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, আশশামস দারুন নাজাহ মাদরাসা।