জ্বালানি তেলের সঙ্কটে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাসে বিঘœ

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাচ্ছে না লাইটার জাহাজগুলো। ফলে পণ্য লোড করার ৪৮ ঘণ্টায়ও বন্দর এলাকা ছাড়তে পারছে না জাহাজগুলো। পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহের উদ্যোগ না নিলে দেশের সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা ছাড়া জাহাজগুলোর অতিরিক্ত সময় অপেক্ষার ডেমারেজ ভোক্তাদের উপরতো চাপবেই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়ার পর এবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারীরা।

ডব্লিউটিসিসি সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানীকৃত পণ্যের বিশেষ করে বাল্ক জাহাজে আমদানীকৃত খোলা পণ্যের ৮০ শতাংশ নদীপথে পরিবহন করা হয় এবং ১২ শ’র মতো লাইটার জাহাজ এসব পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে। লাইটার জাহাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমদানীকৃত পণ্যবোঝাই মাদার ভেসেলের বিপরীতে ডব্লিউটিসিসি থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ৮০টি লাইটার জাহাজ বুকিং বা বরাদ্দ দেয়া হয়। একটি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা গন্তব্যে যাওয়া ও আসা বাবদ তিন হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ৮০টি জাহাজে প্রতিদিন দুই লাখ ৪০ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার লিটার, যা চাহিদার ২০ শতাংশের কাছাকাছি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় জাহাজ বরাদ্দ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তা ছাড়া পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের অভাবে মাদারভেসেল থেকে পণ্য লোড নিয়েও অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। ফলে জাহাজগুলো সময়মতো গন্তব্যে গিয়ে পণ্য খালাস করতে না পারায় লাইটার জাহাজের সঙ্কটও বাড়ছে। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৬৪টি জাহাজ ছিল। এর মধ্যে পাঁচটি কয়লা বোঝাইসহ সাধারণ পণ্যবাহী ১৬টি, খাদ্যশস্য বোঝাই ২০টি, সিমেন্ট ক্লিংকার বোঝাই ১৮টি, চিনি বোঝাই চারটি জাহাজ এবং তেলবাহী ছয়টি ট্যাংকার ছিল। লাইটার জাহাজের জ্বালানি তেল সঙ্কটে আমদানি পণ্য নিয়ে আমদানিকারক ও পরিবহন খাতে নিয়োজিত ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে।

এসব জাহাজে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা যেমনি রয়েছে, বিভিন্ন শিল্প কারখানার কাঁচামাল, খাদ্যদ্রব্য ও সারসহ অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য রয়েছে। মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতার প্রভাব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যেমনি পড়বে, তেমনি ব্যাহত হবে শিল্পোৎপাদনও।

এদিকে গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল-বিডব্লিউটিসিসি তাদের বরাদ্দকৃত লাইটার জাহাজে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ না করার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে আগত মাদারভেসেলগুলো থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম হওয়ার হাত থেকে রক্ষার স্বার্থে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চালু রাখার আবেদন জানিয়েছে। বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের কনভেনর সফিক আহমেদ প্রেরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- অত্র সংস্থা হতে বিগত ৯ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পত্রের মাধ্যমে উল্লিখিত বিষয়াবলির আলোকে বিশদভাবে জানিয়ে একটি পত্র প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নদীপথে চলাচলকারী লাইটার জাহাজগুলোয় জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা) মেরিন ডিলারদের চাহিদা মোতাবেক জ্বালানি তেলের সরবরাহ না দেয়ার কারণে আমাদের সংস্থার পরিচালিত জাহাজগুলোতে চাহিদা মোতাবেক জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সঙ্কটে লাইটার জাহাজগুলো মাদারভেসেল হতে নিয়মিতভাবে মালামাল লোডিংয়ে যেতে পারছে না, এমনকি পণ্যবোঝাই নিয়ে খালাসের উদ্দেশ্যে যাত্রাও করতে পারছে না। যার দরুন দিন দিন চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটার জাহাজের স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে খুব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে আগত মাদারভেসেলগুলো হতে পণ্য খালাসকার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরে আগত মাদারভেসেলগুলো হতে পণ্য খালাসের সমস্যার কারণে মাদারভেসেলের অবস্থানকাল দীর্ঘায়িত হলে বা বৃদ্ধি পেলে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদারভেসেল আসতে অনীহা প্রকাশ করবে এবং মাদারভেসেলের ডেমারেজ খাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ হতে চলে যাবে। যার ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশের ভোক্তা পর্যায়ে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। এরূপ সঙ্কটের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য লাইটার জাহাজগুলোর চলাচল নিয়মিত রাখতে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ রাখা অত্যাবশ্যক।

চিঠিতে উল্লিখিত বিষয়ে সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে মন্ত্রী বা মন্ত্রীর উপযুক্ত কোনো প্রতিনিধির সাথে ডব্লিউটিসিসির প্রতিনিধিদের একটি সাক্ষাৎকারের আয়োজন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ডিজেল সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি সাফার করছে লাইটার জাহাজ। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় আমরা লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দিতে পারছি না। দৈনিক দুই লাখ ৪০ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে মিলছে ৪০-৫০ হাজার লিটার ডিজেল। ফলে দেখা যাচ্ছে কোনো রকমে মাদারভেসেল থেকে পণ্য লোড করে নিচ্ছি, কিন্তু জাহাজটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রাওনা করাতে পারছি না প্রয়োজনীয় তেল না পাওয়ার কারণে। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাবে। দৈনিক গড়ে ৫০-৬০টি জাহাজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যেতে পারছে না। আজ যেগুলো আটকা পড়ছে সেগুলো হয়তো কোনো রকমে দু’দিন পরে রাওনা করতে পারছে, কিন্তু এই দুই দিনের মধ্যে নতুন জাহাজ যোগ হচ্ছে। তিনি বলেন, তেল যেহেতু পুরোপুরি পাচ্ছে না, সে জন্য পণ্য লোড করার পরও যেতে পারছে না।

গত প্রায় ১৫ দিন ধরে এই সঙ্কট চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে সংস্থার পক্ষ থেকে বিপিসিকে চিঠি দিয়েছি। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে ঈদের পরদিন চট্টগ্রামের বাসায় দেখা করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়েছি। সর্বশেষ গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী বরাবর চিঠি দেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের-বিপিসির সচিবসহ গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে পারেন এমন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেউই ফোন ধরেননি। তবে বিপিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, মাঝে ঈদের বন্ধে যানবাহনে বাড়তি সরবরাহ দিতে হয়েছে। ফলে এদিকে হয়তো কিছুটা কম দিতে হয়েছে। বর্তমানে দুই লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুদ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন যেহেতু ঈদের ছুটি শেষ হয়েছে লাইটার জাহাজগুলোতে ডিজেল সরবরাহে স্বাভাবিকতা ফিরবে বলে তিনি আশাবাদী।