অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ (বিএসইসি) পুঁজিবাজারের অন্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে সমন্বয়হীনতাসহ কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হতে দেরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার। তিনি বলেন, সিএসইর প্রস্তুতি অনুযায়ী দেশে একটি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ এখন থেকে দেড়-দুই বছর আগে চালু করা সম্ভব ছিল; কিন্তু সরকার পরিবর্তন এবং বারবার নীতির পরিবর্তনের কারণে এটি চালু করতে দেরি হচ্ছে।
গতকাল রোববার সকালে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক একটি কর্মশালায় আমন্ত্রিত অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিএমজেএফ এবং সিএসইর যৌথ উদ্যোগে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কমিশনার ফারজানা লালারুখ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে সিএসইর চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেন। কর্মশালায় কমোডিটি মার্কেটের ধারণা ও কাঠামোর কার্যকারিতার ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএসই’র সহকারী জেনারেল ম্যানেজার ফয়সাল হুদা।
প্রধান অতিথি বিএসইসি কমিশনার ফারজানা লালারুখ বলেন, আমরা ক্যাপিটাল মার্কেটকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে চাই; কিন্তু বাস্তবে আমরা এর জন্য কতটুকু প্রস্তুত তাও আমাদের দেখতে হবে। আমরা মিউচুয়াল ফান্ডকেও কার্যকর করতে পারিনি। তাই নতুন কিছু নিয়ে আগাতে আমরা সবধরনের প্রস্তুতি নিয়েই আগাতে চাই। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে সিএসই’র কমোডিটি ডেরিভেটিভস প্রবিধান অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এখন এক্সচেঞ্জের প্রস্তুতি, পণ্য নির্বাচন ও এক্সচেঞ্জের সক্ষমতা নিশ্চিত হলেই পরবর্তী ধাপে যাওয়া যাবে।
তিনি আরো বলেন, পুঁজিবাজারের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে ইক্যুইটি, বন্ড ও কমোডিটি; কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাাজর দীর্ঘদিন থেকে শুধু ইক্যুইটি-নির্ভর হয়ে আছে। কমোডিটি ডেরিভেটিভস নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি এড়াতে সাংবাদিকদের দ্বায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, আমাদের দেশের শেয়ারবাজার এখনো মূলত একটি ইক্যুইটি-নির্ভর মার্কেট। উন্নত বাজারগুলোর মতো কমোডিটি বা ডেরিভেটিভের মতো পণ্য যুক্ত করতে গেলে যে টেকনিক্যাল নো হাউ দরকার তা আমাদের নেই। তা ছাড়া আমাদের স্টক এক্সচেঞ্জগুলো এখনো বিদেশী প্রযুক্তিনির্ভর। উন্নত ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, সার্ভার এবং এগুলোর সাথে যুক্ত হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আমদানিনির্ভর হওয়ায় সময় ও ব্যয় বেড়েছে। আমরা দেড় বছর আগেই এসব প্রবুক্তিগত প্রস্তুতি শেষ করেছি; কিন্তু আইনগত কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বহীনতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি থেমে রয়েছে।
কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বা ডেরিভেটিভস বিশ্বব্যাপী ক্যাপিটাল মার্কেটের পণ্য। বিশ্বের ক্যাপিটাল মার্কেটের বাজার সাইজের ৬০ শতাংশের বেশি কমোডিটি ও ডেরিভেটিভ-নির্ভর। এটি বাংলাদেশে ২০২৩ সালে শুরুর কথা থাকলেও যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে সেটি করা সম্ভব হয়নি। এটি আমাদের দেশে নতুন ধারণা, তাই অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, জিডিপির দিক থেকে আমাদের দেশ পিছিয়ে থাকলেও ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তানে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু আছে। ভারতে তারও আগে থেকে চালু আছে। নেপালের মতো দেশেও ২০০৯ সাল থেকে চলছে কমোডিটি মার্কেট। আমাদের দেশে দেরিতে চালু হওয়ার কারণ হলো, এটি নিয়ে অনেক সচেতনতা বাড়ানোর বিষয় ছিল, যেটি আমরা করছি। যদিও আমাদের প্রস্তুতি অনুযায়ী দেড়-দুই বছর আগে এটি চালু করার সুযোগ ছিল। রেগুলেটরি বডির সাথে সমন্বয়হীনতাসহ কিছু কারণে এটি আসতে দেরি হচ্ছে। আমরা কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর অনুমোদন পেয়েছি; কিন্তু এখনো কোন পণ্য দিয়ে এক্সচেঞ্জ চালু হবে তার অনুমোদন এখনো পাইনি।
তিনি আরো বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জের টেকনোলজির সক্ষমতা এখনো ৬০ শতাংশের বেশি বহির্বিশ্বনির্ভর। আমাদের কমোডিটিজের জন্য প্রয়োজনীয় টেকনোলজিসও দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়েছে। এতে কিছুটা দেরি হয়েছে। রুলস অনুযায়ী কমোডিটিজ মার্কেটের জন্য আলাদা ব্রোকার তৈরি করতে হয়েছে। এ জন্যও দেরি হয়েছে। সব শেষ করেও এটি দেড়-দুই বছর আগে চালু করা সম্ভব ছিল, যেটি সমন্বয়হীনতার কারণে সম্ভব হয়নি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিএসই চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান বলেন, কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে কিছু নীতির কারণে আমাদের কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু করতে দেরি হচ্ছে। এখন আমাদের প্রস্তুতি অনেক এগিয়ে গেছে। আশা করছি, এটি চলতি বছরের মধ্যে হয়তো চালু করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু করতে এখন পর্যন্ত আমাদের ১০০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এটিকে শুরু করতে আরো কিছু টাকা ব্যয় হবে। আমাদের প্রস্তুতি শেষের দিকে রয়েছে। আমাদের টিমও বিদেশ থেকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে এবং টেকনোলজিও প্রস্তুত রয়েছে।



