মন্তব্য প্রতিবেদন

ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সঙ্কট : বাজার সিন্ডিকেট ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ

Printed Edition

মীযানুল করীম

বাংলাদেশের বাজারে সরিষা, সয়াবিন, পাম অয়েল, সুপার পাম ও সূর্যমুখীÑ বিভিন্ন ধরনের ভোজ্যতেল প্রচলিত। দৈনন্দিন রান্নার অপরিহার্য এই পণ্যটি যখন দামের অস্থিরতা বা সরবরাহ সঙ্কটে পড়ে, তখন তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ভোজ্যতেলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন হলোÑ এই চাপ কি স্বাভাবিক বাজার-চাহিদার ফল, নাকি কাঠামোগত ত্রুটি ও নিয়ন্ত্রণহীনতার প্রতিফলন?

বাজার সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের আগে কিছু মহল কৃত্রিমভাবে সঙ্কট তৈরি করে। তাদের দাবি, মজুদ ও ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ব্যবস্থার অপব্যবহার করে সরবরাহশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলা হয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জকেন্দ্রিক কিছু ব্যবসায়ী চক্রকে ঘিরে এমন অভিযোগ ওঠে। সমালোচকদের ভাষায়, বড় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বাজারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে, যা মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি করে। তবে এসব অভিযোগ প্রমাণসাপে এবং সামগ্রিক বাজারব্যবস্থার কাঠামোগত বিশ্লেষণ ছাড়া এককভাবে দায় চাপানোও সমীচীন নয়।

অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য ভিন্ন। সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দামের ওঠানামা, আমদানিনির্ভরতা, ডলারের বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যয়Ñ এসব কারণ মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। সরকার বাজার স্থিতিশীল রাখতে ট্যারিফ সমন্বয়, আমদানি সহজীকরণ এবং ভর্তুকির মতো ব্যবস্থা নেয়। কিছু েেত্র মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। তাই সঙ্কটকে পুরোপুরি ‘কৃত্রিম’ বলা হলে বাস্তব অর্থনৈতিক উপাদানগুলো উপেতি হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার একটি বড় অংশ প্রান্তিক পর্যায়ে বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা। স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রয় তদারকি, স্বচ্ছ কার্ড বা টিসিবি কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ মাঝে মাঝে উঠে আসে। স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উপস্থিতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কমদামে সরবরাহ করা পণ্যও সঠিকভাবে ভোক্তার হাতে পৌঁছায় না। ফলে নীতিগত উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।

একজন ব্যবসায়ীর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, পথে পথে অনানুষ্ঠানিক ব্যয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো গেলে পণ্যের দাম অনেকাংশে সহনীয় হতে পারে। এ ধরনের কাঠামোগত ব্যয় সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করে। বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমতে পারেÑ এমন মতও রয়েছে।

এখানে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণÑ ঈদের মতো উৎসবকালীন সময়ে চাহিদা বৃদ্ধি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চাহিদা যদি আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে মোকাবেলা করা না হয়, তাহলে সাময়িক ঘাটতি বা মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। আমদানি চুক্তি, মজুদ পর্যবেণ এবং বাজার তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার।

সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ব্যয় বৃদ্ধি করে। খাদ্যতালিকায় তেল একটি মৌলিক উপাদানÑ তাই এর দাম বাড়লে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে চাপ পড়ে। সামাজিকভাবে এটি সংবেদনশীল একটি ইস্যু। সুতরাং কেবল অভিযোগ বা পাল্টা-অভিযোগ নয়, বরং সমন্বিত নীতি, কার্যকর তদারকি এবং বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাই টেকসই সমাধান।

সবশেষে বলা যায়, ভোজ্যতেলের বাজারে স্থিতিশীলতা রার জন্য তিনটি দিক জরুরিÑ প্রথমত, আমদানি ও মজুদব্যবস্থার স্বচ্ছতা; দ্বিতীয়ত, বিতরণ চেইনে জবাবদিহি ও অনিয়ম দমন; তৃতীয়ত, ভোক্তা সুরায় কার্যকর নজরদারি। সিন্ডিকেট, মজুদদারি বা কাঠামোগত দুর্বলতাÑ যে কারণই থাকুক, ভোক্তাই শেষ পর্যন্ত তিগ্রস্ত হন। তাই বাজার স্থিতিশীল রাখা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্নও বটে।