দেশের সব বিমানবন্দরে জঙ্গি হামলার সতর্কতা

প্রশাসনে উগ্রবাদবিরোধী শুদ্ধি অভিযান

এস এম মিন্টু
Printed Edition

দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক গতকাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিমানবন্দরগুলো সবসময়ই নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকে; তবে পুলিশ সদর দফতরের সতর্কবার্তার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে সার্বভৌম বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে উগ্রবাদবিরোধী শুদ্ধি অভিযান চলছে। এখন পর্যন্ত কয়েকজন সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েকজন সদস্য কর্মস্থল থেকে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও প্রশাসনে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, দেশের আটটি বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নাশকতার আশঙ্কায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। একই সাথে নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের গতিবিধি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

গত শনিবার রাতে সাভারের ধামরাই এলাকা থেকে উগ্রবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে এক যুবককে আটক করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই যুবকের সাথে সার্বভৌম বাহিনীর দুই কর্মকর্তার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে আদালতে হাজির করার পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি এবং জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় সম্ভাব্য নাশকতার পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে সূত্র দাবি করেছে।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ভেতরে কিছু সদস্যের সাথে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সম্ভাব্য যোগাযোগের অভিযোগে ব্যাপক তদন্ত চলছে। গত ২০ এপ্রিল ভোর থেকে শুরু হওয়া অভিযানের পর বিমানবাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোরের একাধিক ঘাঁটিতে নজরদারি চালিয়ে কয়েকজনকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একই সময়ে কয়েকজন সদস্য দেশত্যাগ করেছেন বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই যোগাযোগের প্রকৃত বিস্তৃতি নিরূপণে এখনো তদন্ত চলছে। অভিযানের পর বিমানবাহিনীর সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে এবং বেসামরিক কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

ঝিনাইদহে উদ্ধার আফগান নাগরিকের লাশ : মানবপাচার চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য

ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর সীমান্তবর্তী পলিয়ানপুর বিওপির কাছে ইছামতি নদী থেকে ভেসে আসা এক আফগান নাগরিকের লাশ শনাক্ত হয়েছে। নিহত ব্যক্তি হাশমত মাহমুদী বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও আইনি জটিলতার কারণে তার সৎভাই মীর ওয়াইস মাহমুদী এখনো লাশ গ্রহণ করতে পারেননি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মীর ওয়াইস মাহমুদী লাশের দাবিদার হিসেবে ঝিনাইদহে এলে পুলিশ তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। তিনি জানান, তার সৎভাই হাশমত মাহমুদী আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং তিনি ভারতের কারাগারে প্রায় পাঁচ বছর বন্দী ছিলেন। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তার সাথে পরিবারের যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়। সে সময় হাশমত মাহমুদী লন্ডনে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান এবং বাংলাদেশ হয়ে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

সূত্রগুলো আরো জানায়, নিহত ব্যক্তি ভারতে অবস্থানকালে মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকেই দাবি করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সীমান্ত এলাকায় পৌঁছানোর পর কোনো বিরোধ বা চক্রগত কারণে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার (এসপি) মাহফুজ রহমান জানান, গত ১৩ এপ্রিল ইছামতি নদী থেকে লাশটি উদ্ধার করা হলেও পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় অজ্ঞাত হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশের পর স্বজনরা লাশ শনাক্ত করেন। লাশের দাবিদাররা লন্ডন থেকে এসে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করার পর তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আফগানিস্তান দূতাবাসের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়া হয়।

এসপি আরো জানান, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আদালতের নির্দেশনা সাপেক্ষে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করতে হবে। ডিএনএ মিললে দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে লাশ হস্তান্তর করা হবে। তিনি বলেন, নিহত ব্যক্তি উগ্রবাদ বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়; তবে মানবপাচারকারী চক্রের সাথে সম্পৃক্ততার বিষয়টি পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সারা দেশে বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা

পুলিশ সদর দফতর থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য নাশকতার সতর্কবার্তা জারির পর দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, বিমানবন্দরগুলো সবসময়ই নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকে; তবে সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে, যা নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।

পুলিশ সদর দফতর বৃহস্পতিবার পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। যদিও চিঠিতে সংগঠনটির নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে সম্প্রতি ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামে এক সদস্যকে গ্রেফতারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।