‘মিরাশার চাষি বাজার’ এখন দক্ষিণাঞ্চলের মডেল

মধ্যস্বত্বভোগীশূন্য বাজারে প্রতিদিন লেনদেন সাড়ে তিন শ’ কোটি টাকা

Printed Edition
জাজিরায় মিরাশার চাষি বাজার : নয়া দিগন্ত
জাজিরায় মিরাশার চাষি বাজার : নয়া দিগন্ত

মো: বোরহান উদ্দিন রব্বানী শরীয়তপুর

কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা বাংলাদেশের কৃষকের বহুদিনের দাবি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর তাদের অস্বচ্ছ লেনদেনে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের। এই বাস্তবতায় ব্যতিক্রম এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার মিরাশার ‘চাষি বাজার’। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়ায় এই বাজার এখন পরিণত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কৃষি বাজারে।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন ও সমবায় কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে মাত্র ৩২ শতক জমির ওপর যাত্রা শুরু করে মিরাশার বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের এই বাজার। সময়ের পরিক্রমায় ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা বাড়তে থাকায় বর্তমানে এর আয়তন দাঁড়িয়েছে চার একরে। চলতি মৌসুমে চাহিদার কথা মাথায় রেখে আরো এক একর জমি বাড়ানো হয়েছে।

ভরা মৌসুমে, বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, এই বাজারে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার কৃষিপণ্য লেনদেন হয়। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় পাইকার ও ১০ হাজারের বেশি কৃষক বিক্রেতার সরব উপস্থিতিতে বাজারটি হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল। এখানে পেঁয়াজ, রসুন, শাকসবজি, শসা, কুমড়া, বেগুনসহ সব ধরনের মৌসুমি কৃষিপণ্য বেচাকেনা হয়। তবে মুড়িকাটা পেঁয়াজের মৌসুমে বাজারটি সবচেয়ে জমজমাট থাকে। শুধু শরীয়তপুরই নয়, পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর জেলার কৃষকরাও নিয়মিত এখানে ফসল বিক্রি করতে আসেন।

জাজিরার পালেরচরের কৃষক কাশেম আলী বলেন, মিরাশার চাষি বাজার আমাদের জন্য সত্যিকারের আস্থার জায়গা। এখানে কোনো ঝুট-ঝামেলা নেই, দালালও নেই। খুব সহজেই ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করতে পারি। বাড়তি খরচ না থাকায় আমাদের লাভও বেশি হয়।

মাদারীপুরের সিলারচর এলাকার কৃষক মফিজুল বলেন, এই বাজারে ফসলের দাম ভালো পাওয়া যায় বলেই পেঁয়াজ, রসুন, শসা বিক্রি করতে এখানে আসি। একদিনেই সব বিক্রি করে বাড়ি চলে যেতে পারি। এতে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হয়।

বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল জলিল মাদবর জানান, অদৃশ্য খরচ না থাকা ও ঝামেলামুক্ত ব্যবস্থাপনার কারণেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা এখানে আসেন। এই বাজার তাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ ছাড়াও রাজধানীর কাওরান বাজার, সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা পর্যন্ত এই বাজারের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে।

জাজিরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: ওমর ফারুক বলেন, কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে আমরা বাজার ব্যবস্থাপনার কাজ করছি। নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে, যাতে কেউ হয়রানির শিকার না হন এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় থাকে।

মিরাশার চাষি বাজার শুধু একটি বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, এটি সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে কৃষক সরাসরি পাইকারের সাথে লেনদেন করায় মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা নেই বললেই চলে। ফলে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, তেমনি ভোক্তাও সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারছেন। কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও স্বচ্ছতার এই মডেল দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অনুসরণ করা গেলে কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন আরো সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।