দেড় যুগ পর স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে ফিরছে কুচকাওয়াজ

Printed Edition
স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন বাহিনীর কুচকাওয়াজের মহড়া  : নয়া দিগন্ত
স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন বাহিনীর কুচকাওয়াজের মহড়া : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার কুচকাওয়াজের ‘চূড়ান্ত রিহার্সাল’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁয়ে পুরাতন বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতেই তাদের আমন্ত্রণ জানানো, রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শন, সমরাস্ত্র প্রদর্শনীসহ সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। আগামীকাল সকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং ৯ পদাতিক ডিভিশনের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে আয়োজিত মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করবেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। এ সময় কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০০৮ সালের পর অর্থাৎ ১৮ বছর পরে এবার ২৬ মার্চের আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত হচ্ছে এ প্রদর্শনী। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কুচকাওয়াজ বা প্যারেড প্রদর্শনী হয়নি। তবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনে এ আয়োজন থাকত।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবার স্বাধীনতা দিবসে জাঁকজমকভাবে এ আয়োজন করতে রোজার শুরু থেকে প্যারেড স্কয়ার মাঠে প্রস্তুতি শুরু হয়। গতকাল মঙ্গলবার ‘চূড়ান্ত রিহার্সেলের’ মাধ্যমে তার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো।

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় ‘চূড়ান্ত রিহার্সাল’ অনুষ্ঠানে দলগুলো প্রস্তুত হতেই অশ্বারোহী হয়ে নেতৃত্ব দিতে আসেন প্যারেড অধিনায়ক নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও সাভার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হক। এর পর উপ-অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাফকাতুল ইসলামের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব বুঝে নিয়ে গ্রাউন্ডে আমন্ত্রণ জানান জাতীয় পতাকাবাহী দলকে।

সশস্ত্র সালাম প্রদর্শনের পর পর প্যারেড গ্রাউন্ডে পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর পালা। রাষ্ট্রের দুই সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে মিলিটারি পুলিশের সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ আমন্ত্রণ জানানো থেকে শুরু করে সবশেষ বিমানবাহিনীর দৃষ্টিনন্দন ‘অ্যারোবেটিক শো’। এর আগেও বেশ ক’দিন ধরে সেনা, নৌ, বিমান, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, বিজিবি, কারা পুলিশসহ বিএনসিসির সদস্যরা অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করছিলেন।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও চূড়ান্ত মহড়ার দিন অনুষ্ঠান শুরু হলো কিছুটা দেরিতে। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে বহনকারী গাড়িকে মিলিটারি পুলিশের সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবস কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণের আহ্বান জানানো এবং রাষ্ট্রপতিকে সশস্ত্র সালাম দেয় প্যারেড। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত বাজতে থাকলে প্যারেডের দর্শক সারির সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। এর পর প্যারেড অধিনায়ক রাষ্ট্রপতিকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের অনুরোধ জানান।

রাষ্ট্রপতিকে অনুষ্ঠানের দিন যেভাবে প্যারেড গ্রাউন্ড ঘোরানো হবে, একইভাবে খোলা জিপ প্যারেড গ্রাউন্ডে এগিয়ে যেতে থাকে। সঙ্গী হিসেবে জিপে থাকেন প্যারেড অধিনায়ক আসাদুল। এ সময় বাদ্য দল ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’ গানের সুর বাজাতে থাকে। প্রায় ১৫ মিনিটের রাষ্ট্রপতির প্যারেড পরিদর্শনের পর অধিনায়ক আবারো ঘোড়ায় আরোহণ করে রাষ্ট্রপ্রধানকে ধন্যবাদ জানান। এর পর অধিনায়ক কুচকাওয়াজ শেষ করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমতি চেয়ে ঘোড়ায় চড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। অধিনায়কের নেতৃত্বে প্রত্যেকটি দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শনের জন্য এগিয়ে আসতে থাকে। ছন্দবদ্ধ পায়ে সম্মুখে এই দৃপ্ত যাত্রা, মুষ্টিবদ্ধ হাত আর তাল মিলিয়ে প্রত্যয়ী শপথের এই প্রদর্শনী চলতে থাকল জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে। মার্চপাস্টের প্রথমে থাকে বিভিন্ন পতাকাবাহী তিনটি দল বা কন্টিনজেন্ট। এর পর পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতিকে সালাম দিতে দিতে এগিয়ে যেতে থাকে সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাজোয়া রেজিমেন্ট কন্টিনজেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ ইনফ্যান্টারি রেজিমেন্ট, আর্টিলারি কন্টিনজেন্ট, এয়ার ডিফেন্স কন্টিনজেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারস কন্টিনজেন্ট, সিগনালস কন্টিনজেন্ট, সার্ভিসেস কন্টিনজেন্ট।

জাতীয় পতাকাবাহী কন্টিজেন্টের সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানান, দলটি সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গ্যালারিতে থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা সালাম প্রদর্শন করেন আর অন্য দর্শকরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান।

এর পর পর্যায়ক্রমে আসে প্যারাকমান্ডো কন্টিনজেন্ট, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, কারা পুলিশ, সম্মিলিত নারী কন্টিনজেন্ট ও মডারনাইজড ইনফ্যান্টারি কন্টিনজেন্টগুলো সালাম প্রদর্শন করে মার্চপাস্ট করে বেরিয়ে যায়।

সেনা ও বিজিবির ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী কন্টিনজেন্টের পর খোলা গাড়িতে বহনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কন্টিনজেন্ট এগিয়ে যায়। ১০ হাজার ফুট উপর থেকে মূল মঞ্চের দুই দিকে ২৬ জন প্যারাট্রুপার প্যারেড গ্রাউন্ডে নামেন, যারা জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা বহন করেন। এর পর প্যারাকমান্ডো টিমের প্যারাট্রুপার দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শন করেন। এর মধ্যেই মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান। পর্যায়ক্রমে আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার, বিজিবি এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, র‌্যাব এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, নেভাল অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার উড়ে যায়। এর পর প্যারেড গ্রাউন্ডে একে একে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহরগুলো; যেখানে ট্যাংক, কামানের মতো ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিসহ নানা সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়। এর পরে শুরু হয় কুচকাওয়াজের এবারের অন্যতম আকর্ষণ বিমানবাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শো’র মহড়া। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই প্রতিপাদ্যে বিমানবাহিনীর যুদ্ধ বিমানসহ প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারগুলোর বিভিন্ন ফরম্যাশনে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শিত হয়।

পাঁচটি এফ-সেভেন যুদ্ধবিমান বর্ণিল রং ছাড়তে ছাড়তে প্যারেড গ্রাউন্ড প্রদক্ষিণ করে। ‘লো লেভেল’ ফ্লাইং বিমান প্রদর্শনীর পর যোগ দেয় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান।

এই আধুনিক যুদ্ধবিমানটি রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্লাইং স্যালুট’ প্রদর্শন করে। এর পর কয়েক দফা টার্ন পারফরম্যান্স, লো লেভেল ফ্লাইংও প্রদর্শিত হয়। শেষে মূল মঞ্চের পেছন দিক থেকে এসে ‘ভিক্টোরি রোল’ প্রদর্শন করে উপরের দিকে মেঘের আড়ালে চলে যায় মিগ-২৯, যেটিকে ‘চূড়ান্ত প্রদর্শনী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সবশেষে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ৭২৫ জনের বাদক দল মার্চপাস্ট করতে করতে প্যারেড গ্রাউন্ড ছেড়ে যায়, এ সময় তারা ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ গানটি বাজাতে থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বৃহস্পতিবার আয়োজিত হবে এই কুচকাওয়াজ।