ট্রাম্প-শি ঐতিহাসিক বৈঠক

তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরান সঙ্কটে ঐকমত্য

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এক নতুন মেরুকরণের সাক্ষী হলো বেইজিং। দীর্ঘ ৯ বছর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে উত্তেজনা, কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমীকরণের এক জটিল সংমিশ্রণ। বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার দুই দিনব্যাপী শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনটি ছিল ঘটনাবহুল। এক দিকে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের কড়া সামরিক হুঁশিয়ারি, অন্য দিকে ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের সমাধানে দুই পরাশক্তির নজিরবিহীন ঐকমত্যÑ সব মিলিয়ে এ বৈঠকটি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

তাইওয়ান : সম্পর্কের সর্বোচ্চ ‘রেড লাইন’

বৈঠকের শুরুতেই শি জিনপিং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান পরিষ্কার করেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দুই ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শি জিনপিং ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান ইস্যুটি যদি সঠিকভাবে সামলানো না হয়, তবে এটি কেবল দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরাবে না, বরং সরাসরি সামরিক সঙ্ঘাত বা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমানে ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল মার্কিন অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে বেইজিং দীর্ঘকাল ধরেই তাদের তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে। শি জিনপিং বিষয়টিকে চীনের সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন। যদিও বৈঠকে উপস্থিত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চীন সবসময়ই তাদের এ উদ্বেগের কথা জানায়, তবে তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এই ‘ওয়ার্নিং’ বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর এবং এটি সরাসরি ওয়াশিংটনকে একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

ইরান সঙ্কট ও হরমুজ প্রণালীতে ঐকমত্য

শীর্ষ সম্মেলনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই দেশের একমত হওয়া। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে। হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছেÑ ট্রাম্প ও শি জিনপিং উভয়েই এই প্রণালীটি অবিলম্বে উন্মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন।

চীন বর্তমানে ইরানি তেলের বৃহত্তম ভোক্তা হওয়ায় তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন যে, চীন তাদের এই প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করবে। বিনিময়ে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে আমেরিকা থেকে সরাসরি অপরিশোধিত তেল আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বেইজিং। শি জিনপিং এই প্রণালীতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচলে অবৈধ শুল্ক আদায়ের চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তবে ইরানকে চাপে ফেলতে চীন ঠিক কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে কিছুটা সংশয় রয়েই গেছে।

বাণিজ্যের মোড়কে বড় অর্থনৈতিক চুক্তি

ট্রাম্পের এই সফরে তার সাথে মার্কিন করপোরেট জগতের একঝাঁক শীর্ষ ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। টেসলার এলন মাস্ক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং অ্যাপলের টিম কুকের উপস্থিতি বাণিজ্যিক আলোচনার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের এবারের লক্ষ্য ছিল চীনের বাজারকে মার্কিন শিল্পের জন্য আরো উন্মুক্ত করা এবং বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই সফরে চীনের পক্ষ থেকে বোয়িং বিমানের একটি বড় মাপের ক্রয়াদেশ আসার ঘোষণা আসতে পারে। এ ছাড়া গত অক্টোবর মাসে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে উভয় দেশই সম্মত হয়েছে। বিনিময়ে চীন চাইছে তাদের ওপর থাকা উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ-মেকিং যন্ত্রপাতির রফতানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হোক। এনভিডিয়ার শক্তিশালী এইচ-২০০ এআই চিপ যাতে দ্রুত চীনে সরবরাহ করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

চোরাচালান ও ফেনটানিল নিয়ন্ত্রণ

বাণিজ্যিক আলোচনার পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তা ইস্যুতেও দুই নেতা বিস্তারিত কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া সিন্থেটিক ড্রাগ ‘ফেনটানিল’ পাচার রোধে বেইজিং কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আগে ড্রাগ চোরাচালান রোধে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে কার্যকর সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ ছিল ওয়াশিংটনের। তবে এবারের বৈঠকে শি জিনপিং এ বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।

অভ্যর্থনা ও টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন

পুরো সফরের পরিবেশ ছিল আড়ম্বরপূর্ণ ও জাঁকজমকপূর্ণ। ট্রাম্পকে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ রাজকীয় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। শত শত শিশু ফুলের তোড়া ও পতাকা নাড়িয়ে দুই নেতাকে স্বাগত জানায়। বৈঠক শেষে বিকেলে দুই বিশ্বনেতা বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ৬০০ বছরের প্রাচীন ‘টেম্পল অব হেভেন’ পরিদর্শন করেন। সেখানে ট্রাম্পকে শি জিনপিংয়ের সাথে বেশ হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে ছবি তুলতে দেখা যায়।

রাতে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে ১০ পদের রাজকীয় খাবার পরিবেশন করা হয়। মেনুতে ছিল বিখ্যাত ‘বেইজিং রোস্ট ডাক’, লবস্টার স্যুপ এবং তিরমিসু। নৈশভোজে শি জিনপিং তার বক্তব্যে বলেন, ‘চীন-মার্কিন সম্পর্ক বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। আমাদের এই সম্পর্ককে সফল করতে হবে এবং কোনোভাবেই একে নষ্ট করা চলবে না।’ জবাবে ট্রাম্প শি জিনপিংকে একজন ‘মহান নেতা’ এবং ‘বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করে সম্পর্কের এক নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা করেন।

ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ চাপ ও হোয়াইট হাউজের আমন্ত্রণ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সফরের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও একটি বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি একটি বড় অর্থনৈতিক বিজয় খুঁজছেন। ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং চীনের বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারলে তিনি নির্বাচনে সুবিধা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রথম দিনের সফল আলোচনা শেষে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজে ফিরতি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই হবে শি’র প্রথম ওয়াশিংটন সফর।

শুক্রবার দুই নেতা মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন এবং চূড়ান্ত যৌথ ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে গভীর বিরোধ রয়েছে, তা হয়তো এখনই কাটছে না। তবে ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থে দুই পরাশক্তি যেভাবে একে অপরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, তা বিশ্বশান্তির জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হতে পারে। বেইজিংয়ের এই শীর্ষ সম্মেলন প্রমাণ করেছে যে, একে অপরের প্রতিযোগী হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বের জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের একে অপরকে প্রয়োজন।