মিউচুয়াল ফান্ডের রূপান্তরে নতুন নীতিমালা জারি

সূচকের সাথে বাজার মূলধনও কমেছে ডিএসইর

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি বা ক্লোজএন্ড মিউচুয়াল ফান্ডকে বে-মেয়াদি বা ওপেনএন্ড ফান্ডে রূপান্তরের জন্য বিস্তারিত নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত বৃহস্পতিবার বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রকাশ করা হয়।

নীতিমালায় সুস্পষ্ট করা হয়েছে, কমিশনের মতে ক্লোজএন্ড ফান্ড অবসায়নের পরিবর্তে ওপেনএন্ড কাঠামোয় রূপান্তর করা হলে বিনিয়োগকারীরা বেশি সুরক্ষা ও আর্থিক সুবিধা পাবেন। কারণ বে-মেয়াদি বা ওপেনএন্ডে রূপান্তরের পর বিনিয়োগকারীরা নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ভিত্তিক সুবিধা ভোগ করতে পারবেন, যা ওই ফান্ড অবসায়নের তুলনায় বেশি লাভজনক ও নিরাপদ। একই সাথে এতে বাজারে নেতিবাচক চাপও কমবে।

বিএসইসি তার নীতিমালায় জানিয়েছে, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ৬২(২) ও ৬৩ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ক্লোজএন্ড ফান্ডকে ওপেনএন্ডে রূপান্তরের সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে কোনো ফান্ডের ছয় মাসের গড় বাজারদর যদি এনএভির তুলনায় ২৫ শতাংশ বা তার বেশি নিচে অবস্থান করে, তাহলে ট্রাস্টিকে ইউনিটহোল্ডারদের মতামত নেয়ার জন্য বিশেষ সাধারণ সভা (এসজিএম) আহ্বান করতে হবে। এ ছাড়া ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টিকে রেকর্ড ডেট ঘোষণা করতে হবে। ট্রাস্টি বোর্ডকে সভার অন্তত ১৪ কার্যদিবস আগে এবং সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি বিষয়টি মূল্যসংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) হিসেবে জাতীয় দৈনিক, অনলাইন পোর্টাল, স্টক এক্সচেঞ্জ, ট্রাস্টি ও অ্যাসেট ম্যানেজারের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।

রেকর্ড ডেট ঘোষণার পর কমপক্ষে ২১ দিনের নোটিশ দিয়ে ইউনিটহোল্ডারদের মতামত নেয়ার জন্য ইজিএম আয়োজন করতে হবে। সভায় তিন থেকে চারজন ইউনিটহোল্ডার রূপান্তরের বিপক্ষে ভোট দিলে ফান্ড লিকুইডেশনের পথে যাবে। অন্য দিকে, রূপান্তরের প্রস্তাব অনুমোদন না পেলে ফান্ডের স্বাভাবিক লেনদেন পুনরায় চালু হবে। নতুন নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, রেকর্ড ডেট থেকে ইউনিট লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে এবং কার্যকর তারিখের তিন দিনের মধ্যে ট্রাস্টি ফান্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। এরপর সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে পুরো রূপান্তরপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

এসজিএম আয়োজনের আগে কমিশনের কাছে তথ্য স্মারক জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। সেখানে সর্বশেষ পোর্টফোলিও, এনএভি, সম্ভাব্য রূপান্তর ব্যয়, আগের আর্থিক পারফরম্যান্স ডিভিডেন্ড ইতিহাস এবং নতুন ফান্ড কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি স্বাধীন অডিটরের মাধ্যমে অডিট ও ভ্যালুয়েশন রিপোর্টও প্রস্তুত করতে হবে।

বিএসইসি আরো জানিয়েছে, ওপেনএন্ড ফান্ডে রূপান্তরের পর ইউনিটগুলো ডিমেট আকারে থাকবে এবং ইউনিটহোল্ডাররা প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় ইউনিট সারেন্ডার করে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে রূপান্তর ব্যয় মোট ফান্ড সাইজের ১ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্লোজএন্ড ফান্ডগুলো গভীর ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত সম্পদ মূল্যের সুবিধা পাচ্ছিলেন না। নতুন গাইডলাইনের ফলে ওপেনএন্ডে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ইউনিটহোল্ডাররা এনএভিভিত্তিক সুবিধা পাবেন এবং যেকোনো সময় ইউনিট সারেন্ডার করে অর্থ তুলতে পারবেন। এতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আরো বেশি সুরক্ষিত হবে।

তিনি আরো বলেন, লিকুইডেশনের ক্ষেত্রে ফান্ডের সম্পদ বিক্রি করতে হওয়ায় বাজারে সেল প্রেসার তৈরি হতে পারে। কিন্তু ওপেনএন্ডে রূপান্তরের ক্ষেত্রে আন্ডারলাইং অ্যাসেট বিক্রিরপ্রয়োজন হয় না। ফলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং বিনিয়োগকারীরাও তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হবেন। রেকর্ড ডেট ঘোষণার পর বাজারদর ধীরে ধীরে এনএভির কাছাকাছি চলে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি । কারণ বিনিয়োগকারীরা তখন বুঝতে পারবেন যে ওপেনএন্ড কাঠামোয় রূপান্তরের মাধ্যমে তারা প্রকৃত সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে সুবিধা পাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, এর আগে নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্লোজএন্ড ফান্ডকে ওপেনএন্ডে রূপান্তর বা অবসায়নের নীতিমালা তৈরির জন্য বিএসইসি পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল। কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক শেখ মো: লুৎফুল কবির ছিলেন কমিটির আহ্বায়ক। এ ছাড়া যুগ্ম পরিচালক সুলতানা পারভীন, সহকারী পরিচালক মো: আতিকুল্লাহ খান এবং সহকারী পরিচালক মো: তৌহিদুল ইসলাম সাদ্দাম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সদস্যসচিব ছিলেন সহকারী পরিচালক মো: সাগর ইসলাম।

এ দিকে সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসের চারটিতেই সূচকের অবনতির ফলে গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধনের বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। এ সময় বাজারটি মূলধন হারায় ৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজার মূলধনের দশমিক ৭৫ শতাংশ। ৩ মে রোববার ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১১৮ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে নেমে আসে ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকায়। ব্যাংকিং খাতের বড় পতনের কারণেই বাজার মূলধনের এ অবনতি দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫২ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ২৮৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট থেকে রোববার যাত্রা করা সূচকটি বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে স্থির হয় পাঁচ হাজার ২৩৪ দশমিক ১০ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটি ১৫ দশমিক ৪০ পয়েন্ট হারালেও ও ডিএসই শরিয়াহ ৫ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।