নকলের ধরন বদলে গেছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এখন আগের সেই সনাতন পদ্ধতিতে নকল আর হয় না। আগেকার দিনে যেভাবে বইয়ের পাতা ছিঁড়ে কিংবা হাতে লেখা পৃষ্ঠা থেকে দেখে দেখে উত্তরপত্রে লেখা হতো এখন সেই ধারণাও পাল্টে গেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে এখন মোবাইলে স্ক্রিনেই সব মিলে। প্রযুক্তির ব্যবহারে পরীক্ষার্থীর টেবিলে বসেই সবকিছু সম্ভব হচ্ছে। তাই বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে নকলের ঝুঁকিও বেড়েছে।
যদিও শিক্ষামন্ত্রী নকলের এসব ঝুঁকি কিংবা আশঙ্কাকে আমলে না নিয়ে চলমান এসএসসি এবং আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপও তিনি নিয়েছেন। আর আগের আইনের কিছু নতুন ধারা যুক্ত করে ১৯৮০ সালের নকল প্রতিরোধ আইনেও মৌলিক কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। গত ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এবারই প্রথম দেশের সবগুলো পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে পরীক্ষার্থীদের উপর নজরধারী করা হচ্ছে। একইসাথে পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনরত শিক্ষক বা পরিদর্শকদেরও নজরদারিতে রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চলমান মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়াসহ প্রয়োজনে মামলা দায়ের করার জন্যও বলা হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষায় একটি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে মর্মে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল সংবাদ প্রকাশ করার পর দেশজুড়ে বেশ হইচই পড়ে যায়। পরে অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদের মুখে সেই সংবাদ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের একটি চিঠি সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, পরীক্ষা চলাকালীন এবং পরীক্ষা-পরবর্তী সময়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের গুজব, প্রশ্নফাঁসের অপপ্রচার কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার মনিটরিংয়ের জন্য সাইবার মনিটরিং সেল গঠন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে সিটিটিসিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া এবং প্রয়োজনে মামলা দায়ের করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপর দিকে পরীক্ষা শুরুর আগের দিন অর্থাৎ গত ২০ এপ্রিল প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন আমরা একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করেছি। সেখানে ডিসি ইউএনওসহ সবাই থাকছেন। তিনি বলেছেন, প্রশ্নপত্র আগের সরকার করেছে, এই ডেটও বিগত সরকার করেছে। আমরা শুধু পরীক্ষা কনডাক্ট করছি। এখন আমরা প্রতিটা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা আছে কি না, সচল না অচল এগুলো সব পাসওয়ার্ড নিয়েছি।
সূত্র জানায়, পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে সরকারের গৃহীত ও করণীয় পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ। বিশেষ করে ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে শুধু শিক্ষা বোর্ড নয়, ব্যাংক ও অন্যান্য চাকরির পরীক্ষাও এই আইনের আওতায় আসবে। একই সাথে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিংবা প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে নকল রোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং পরীক্ষার হলে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নকলের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্ন বা কনটেন্ট অনলাইনে আপলোড হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্ন প্রতারণার মাধ্যমে বিক্রির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকায় এবং রংপুরে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের মিডিয়া সেল জানিয়েছে, চলমান এসএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি চক্র অনলাইনে ভুয়া প্রশ্ন বিক্রি করে প্রতারণা করে আসছে। বিষয়টি পুলিশ সদর দফতরের সহযোগিতা ও এলআইসি শাখার অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট এক প্রতারকের অবস্থান ও এলাকা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর আগেই দেশের সব এমপি ও সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিতে শিক্ষামন্ত্রী লিখেছেন, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রণীত মাধ্যমিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধ ‘পাবলিক পরীক্ষাগুলো (অপরাধ) আইন ১৯৮০’ বাস্তবায়ন এবং এ আইনকে সময়োপযোগী করে সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে বদ্ধপরিকর। এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনী এলাকার সব পরীক্ষা কেন্দ্রে নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধ, পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে অবৈধ জমায়েত নিয়ন্ত্রণ, কোচিং সেন্টার বন্ধ সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবার সহযোগিতাও চেয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।



