ডায়াবেটিস এখন আর শহুরে রোগ নয়

গ্রামের ৪৬ বছরের বেশি বয়সীদের ১৩ শতাংশ আক্রান্ত

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ডায়াবেটিস এখন আর শহুরে রোগ নয়, গ্রামের চিকিৎসা সুবিধাহীন জনগোষ্ঠীর মানুষকেও ধরেছে। এটি এখন আর হুমকি নয়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবতা। এখনই ব্যবস্থা নেয়া হলে নীরব এই মহামারী জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক চাপ বাড়াবে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের কারণে কিডনি রোগ (সিকেডি), হৃদরোগ, ব্রেইন স্ট্রোক, চোখের জ্যোতি কমে যাওয়া (বা অন্ধত্ব) এবং অঙ্গচ্ছেদ বিশেষ করে পায়ের আঙ্গুল কেটে ফেলা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডায়াবেটোলজিস্টরা বলছেন, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে শুধু শহরে নয়, গ্রামের মানুষের মধ্যে নীরবেই বেড়ে চলে রোগটি। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা নেয়ার মতো সুযোগ-সুবিধা নেই।

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে পরিচালিত এই ক্রস-সেকশনাল গবেষণায় বাংলাদেশের মির্জাপুর ডেমোগ্র্যাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম এলাকা থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ৮৯১ জন প্রাপ্তবয়স্ককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের অন্তত পাঁচ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করতে হয়েছে। গবেষণার সাথে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা আগে থেকে নির্ধারিত প্রশ্নমালার মাধ্যমে সামাজিক ও জনতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক ও দেহগত পরিমাপ নেন। প্রিডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে সকালে না খেয়ে থাকা অবস্থায় রক্তের শর্করা বা চিনির পরিমাপ করেন (ফাস্টিং ব্লাড সুগার)। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ আছে (সিকেডি) দেখার জন্য রক্তের সিরাম ক্রিয়েটিনিন এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন পরিমাপ করেন। পাশাপাশি সিরাম অ্যালবুমিন, হিমোগ্লোবিন, মোট কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা পরিমাপ করেন। গবেষকরা সব নমুনা স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে বিশ্লেষণ করেছেন।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ৮৯১ জন গ্রামীণ মানুষের মধ্যে পরিচালিত ডায়াবেটিস সম্পর্কিত গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের ৩৮ শতাংশ (৩৪৩ জন) প্রিডায়াবেটিসে ভুগছেন এবং ১৭ শতাংশ (১৫১ জন) ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রিডায়াবেটিসের হার ৫ শতাংশ এবং এই বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে আছে ১ শতাংশ। অন্য দিকে ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রিডায়াবেটিস রয়েছে ১২ শতাংশ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৩ শতাংশ। উল্লেখ্য, এই ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। এরা যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন তা অনেকেই জানেন না। অন্য দিকে ৪৬ বছর অথবা এর চেয়ে বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রিডায়াবেটিসের হার ২২ শতাংশ এবং এদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ১৩ শতাংশ।

লাইফ সায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণাটির প্রধান গবেষণাকারী হাসনাত সুজন। সাথে রয়েছেন, মশিউর রহমান, আহসানুল হক, তাইয়্যিবা তাবাস্সুম অনন্ত এবং মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সরকার। তাদের গবেষণায় লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই্ ৮৯১ জনের মধ্যে নারীদের প্রিডায়াবেটিসের হার ২২ শতাংশ এবং ডায়াবেটিসের আক্রান্তের হার ৯ শতাংশ। অপর দিকে পুরুষদের প্রিডায়াবেটিসের হার ১৭ শতাংশ এবং তাদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৮ শতাংশ।

গবেষণায় ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে পেটের স্থুলতা (পেটে চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি), দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (সিকেডি), উচ্চ কোলেস্টেরল, কোলেস্টেরলের মধ্যে উচ্চ মাত্রা ট্রাইগিলসারাইড ছিল।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাভিত্তিক ডায়াবেটিস ও চক্ষু গবেষণার (বিপিডিইএস) তথ্য অনুযায়ী, অনেক গ্রামীণ মানুষ ডায়াবেটিসের নাম জেনে থাকলেও রোগটির কারণ, এটা শরীরে বয়ে বেড়ালে কী হতে পারে (ঝুঁকি) এবং রোগটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্বন্ধে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচুর মানুষের ডায়াবেটিস হলেও রোগটি সম্বন্ধে ধারণা ও সচেতনতা একেবারে কম।

ডায়াবেটোলজিস্ট ডা: মো: মোবারক হোসেন বলেন, জানতে না পারলে এবং চিকিৎসা নিতে না পারলে দীর্ঘ সময় শরীরে নিয়ে বয়ে বেড়ালে শরীরের কী কী ক্ষতি হতে পারে সে সম্বন্ধে ধারণা একেবারেই কম। গ্রামে ডায়াবেটিস শনাক্ত ও চিকিৎসার সুবিধাও নেই বললেই চলে। শরীরের নানা ধরনের অস্বস্তি নিয়ে ওষুধের দোকানির কাছে যান তারা। অনেকে অর্ধশিক্ষিত পল্লী চিকিৎসকের কাছেও যান এবং চিকিৎসার নামে যা পেয়ে থাকেন সেটা অপচিকিৎসা।