২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅ-ভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের মাত্র দেড় বছরের শাসনকালকে বিতর্কিত করতে পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী (বেনিফিশিয়ারি) চক্র নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই গণহত্যার দায় মাথায় নিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা পতিত আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এর দায় তখনকার সরকার বিশেষ করে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ওপর চাপিয়ে বিষোদগারে মাঠে নেমেছে পতিত দলটির সমর্থিত লোকজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়িয়ে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে দ্রুত পুনর্বাসন, অবৈধ সুবিধা ভোগ অব্যাহত রাখা এবং দুর্নীতি, লুটপাট ও জুলাই গণহত্যার বিচারের হাত থেকে বাঁচার জন্য মূলত পলাতক ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলগুলো মনে করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারীরা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো বসে আছেন, যারা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে বা ধীরগতিতে কাজ করে সরকারকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছেন। একইসাথে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারকে ব্যর্থ ও বিতর্কিত প্রমাণ করতে নানা ধরনের গুজব, মব-ভিত্তিক সহিংসতা এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, যাতে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারকে কেন বিতর্কিত করতে চাইছে?
বিচার ও জবাবদিহিতা এড়ানো : বিগত ১৬ বছরের (২০০৮-২০২৪) অপশাসন, দুর্নীতি ও জুলাই গণহত্যার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সুবিধাভোগীরা অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে। পতিত সরকারের সময় যারা গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের সাথে জড়িত ছিল, ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা মনে করে ওই অন্তর্বর্তী সরকার তাদের বিচার প্রক্রিয়া তরান্বিত করেছে। বিশেষ করে জুলাই গণহত্যার বিচারের কাজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরে দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। ওই বিচারে পতিত ফ্যাসিবাদ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ কর্মকর্তা ও নেতৃবৃন্দ ফেঁসে যাচ্ছেন। যার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করে তারা বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতি বা বন্ধ করতে চাইছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
রাজনৈতিক পুনর্বাসন : ফ্যাসিবাদের দোসররা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন দেশের সাথে বিশেষ করে চীন, আমেরিকা ও পাকিস্তানের সাথে করা চুক্তি বা সমঝোতাগুলোকে ব্যর্থ হিসেবে তুলে ধরে বর্তমান সরকারের সহানুভূতি অর্জন করতে চাইছে। এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের দোসররা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন করে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা : ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের দোসররা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো ঘাপটি মেরে আছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে বসে থাকা সুবিধাভোগীরা অসহযোগিতামূলক মনোভাব ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পতিত সরকারের সুবিধাভোগীরা বিভিন্ন অপতৎপরতার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেয়া বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিষোদগার করছে এবং এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারের আস্থাভাজন হয়ে ভেতরে ভেতরে শক্তি যুগিয়ে প্রশাসনিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল রেখে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চেষ্টা করছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো : সোস্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে এবং ইতিবাচক কাজকে খাটো করে দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক বর্ণলা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের পর অর্জিত পরিবর্তনকে নস্যাৎ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করা এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে ‘আগের সরকারই ভালো ছিল’ এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং জনগণের কাছ থেকে সমর্থন আদায় করার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে ফ্যাসিবাদের দোসররা। এর মাধ্যমে দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং তাদের কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অনুসন্ধানের জন্য কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। জনস্বার্থে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় ওই রিটটি করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মুহাম্মদ মুহসিন রশিদ। এতে সেই সময়ে গৃহীত বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, সংস্কার কমিশন ও দেশী-বিদেশী চুক্তির বৈধতার বিষয়ে কমিশন গঠন করে অনুসন্ধানের আর্জি জানানো হয়। রিটকারী আইনজীবীর মতে, দেশের স্বার্থে ইউনূস সরকারের সব কর্মকাণ্ডের তদন্ত করা দরকার। রিট আবেদনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও আইন সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদি করা হয়েছে। এ দিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিচার চাচ্ছেন এমন ১০০ জনের ফেসবুক আইডির মধ্যে ৮২ জনই পতিত আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত। আবার বট আইডি দিয়েও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করা হয়ে থাকে। ওইসব আইডির মধ্যে অনেকেই বর্তমানে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর দায়ও ইউনূস সরকারের ওপর চাপিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভিত্তিতে গুজব ছড়াচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ছিল খুবই স্বল্প। এই সময়ের মধ্যে তারা দেশবাসীকে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে, এটা তাদের জন্য অনেক বড় সফলতা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যে কাজটি করতে পেরেছে তাহলো জুলাই গণহত্যার বিচার শুরু করে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের সংস্কারের জন্য কিছু ভালো ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। গত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনামলের গুম, খুন লুটপাটের বিচারের কাজে হাত দিয়েছিল। পতিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের এসব পদক্ষেপ পতিত আওয়ামী লীগের বিপক্ষে চলে যাওয়ায় তারা সুযোগ পেলেই ড. ইউনূসকে ধুয়ে দিচ্ছে। ড. মাসুম মনে করেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের দোসর ও তাদের সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগের অন্তত ৯০ শতাংশ এবং ১০ শতাংশ আছে বাম ঘরানার লোকজন যারা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পছন্দ করে না তারাই অন্তর্বর্তী সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সোস্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরছে, গুজব ছড়াচ্ছে। আমরা জানি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। যেমন সময়ের, কাজের ও নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা কিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছিল, কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছিল সেগুলো সাধুবাদ জানানো উচিত।



