নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা হবে দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব। দলটি সরকার গঠন করতে পারলে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান হবে ‘জিরো টলারেন্স’। চিকিৎসার জন্য ব্যয় করে কেউ নিঃস্ব হবে না, রাষ্ট্র সবার চিকিৎসার সঙ্গী হবে। চিকিৎসা মিলবে হাতের কাছেই। ওষুধ পাওয়া যাবে যৌক্তিক দামে এবং স্বল্প খরচেই সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবে মানুষ।
নারী-শিশু, প্রবীণ ও প্রবাসীদের চিকিৎসায় অগ্রাধিকার দেবে দলটি ক্ষমতায় গেলে। বিশেষায়িত নারী ও প্রবীণ হাসপাতাল চালু, ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ এবং পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হবে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে নিরাপদ সন্তান প্রসবসহ পূর্ণাঙ্গ মাতৃত্বকালীন ও নবজাতক সেবায় এবং প্রবাসীদের চিকিৎসায় অগ্রাধিকার দেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে। স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের বৈষম্য, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ, গ্রাম-শহরের সেবার ব্যবধান ও জনবল সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে জামায়াতের এই প্রতিশ্রুতিগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতের ইসলামীর চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা: মাহমুদ হোসেন বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। চিকিৎসার জন্য মানুষের ঢাকামুখিতা বন্ধ করা হবে, জেলা-উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানো হবে। দেশেই সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে, মানুষকে যেন বিদেশ যেতে না হয় সেই ব্যবস্থা করা হবে।
স্বাস্থ্যকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে জামায়াত স্বাস্থ্যখাতের সব টেন্ডারকে অনলাইনভিত্তিক ই-টেন্ডারে রূপান্তর করবে। হাসপাতালে রোগীর ভোগান্তি কমাতে সিরিয়াল, ভর্তি, অপারেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেডিসিন প্রাপ্তি নিশ্চিতে অটোমেশন সিস্টেম চালু করবে জামায়াত। অধ্যাপক মাহমুদ বলেন, গ্রামে গ্রামে থাকবে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে কার্যকর নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র (জিপি সেন্টার) চালু করা হবে। কার্যকর রেফারেল সিস্টেমের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে জামায়াত। এ ছাড়া জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য ‘অ্যাপ’ চালু করা হবে এবং প্রতিটি উপজেলায় থাকবে ২৪ ঘণ্টা ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স সেবা।
তিনি জানান, ‘চিকিৎসায় ব্যয় করতে গিয়ে কাউকে আর নিঃস্ব হতে হবে না, সরকার সবার চিকিৎসাসঙ্গী হবে।’ জামায়াত ক্ষমতায় গেলে ডিজিটাল হেলথ কার্ড (ওয়ান সিটিজেন-ওয়ান কার্ড) এবং পর্যায়ক্রমে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু করে চিকিৎসা ব্যয়ে সরকার সবার সঙ্গী হবে। এ ছাড়া উপজেলাপর্যায়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হবে।
অধ্যাপক মাহমুদ বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে যৌক্তিক মূল্যে। যৌক্তিক মূল্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ প্রদানের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে জরুরি সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোর প্রচলিত কমিশনবাণিজ্য বন্ধ করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
জামায়াত স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ে তুলবে। দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও স্বাস্থ্যসহকারীসহ লক্ষাধিক স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃজন করে নিয়োগ ও নিয়মিত পদোন্নতি দেওয়া। রোগী এবং চিকিৎসক, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে এবং বেসরকারি ও সরকারি উভয় ক্ষেত্রের চিকিৎসক, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য যুগোপযোগী বেতন কাঠামো করা হবে।
দেশের ৬৪ জেলায় আরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসমৃদ্ধ পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণ এবং কমপক্ষে ৫ বেডের পৃথক ডায়ালাইসিস, আইসিইউ, সিসিইউ ও ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা হবে।
বিদেশমুখিতা ঠেকানোর জন্য জামায়াতের স্লোগান হবে, ‘রোগ আমার, চিকিৎসা আমার দেশেই’। জামায়াত রোগীদের বিদেশমুখিতা বন্ধ করতে সুবিধাজনক স্থানে একাধিক আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। জনপ্রতিনিধিরা নিজ দেশেই চিকিৎসা করাতে অগ্রাধিকার দেবেন। বিদেশী ও প্রবাসীদের জন্য স্বল্প খরচে এবং সেরা চিকিৎসা নিতে রিভার্স হেলথ ট্যুরিজম চালু করবে জামায়াতে ইসলামীর সরকার।
‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’ : মা ও শিশুর পুষ্টি নিরাপত্তা
জামায়াতের স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’। এই কর্মসূচির আওতায় গর্ভধারণের শুরু থেকে শিশুর বয়স দুই বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সময়কে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
এ সময়ে গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা, মা ও শিশুর পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তা, টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সচেতনতামূলক পরামর্শ ও ফলোআপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে দলটি জানিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন তার শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতের দাবি, এই কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে খর্বাকৃতি (স্টান্টিং) ও অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় একটি অংশ সরাসরি জনগণের পকেট থেকে আসে (আউট-অব-পকেট এক্সপেনডিচার), যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দরিদ্র পরিবার, শিশু ও প্রবীণরা। জামায়াতের প্রস্তাবিত এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বয়স্কদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ) এবং শিশুদের অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগ মোকাবেলায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



