এলপিজি আমদানিতে এলসি জটিলতা নিরসনে ঋণসীমা শিথিল

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশে প্রয়োজনীয় এলপিজি (লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) আমদানি নির্বিঘœ রাখতে ঋণসীমাসংক্রান্ত বিধিনিষেধে সাময়িক শিথিলতা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এলপিজি আমদানিতে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) জটিলতা নিরসন এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ সংক্রান্ত গতকাল জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এলপিজি আমদানিকারক কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৬খ(১) ধারায় নির্ধারিত ঋণের সর্বোচ্চ সীমা (এক্সপোজার লিমিট) আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে না। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলো এলপিজি খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত সীমাবদ্ধতা অনুসরণে বাধ্য থাকবে না, যা আমদানিকারকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সম্পূর্ণ সীমা তুলে দেয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ২৬খ(১) ধারায় উল্লেখিত ২৫ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমার পরিবর্তে এই সময়ের জন্য নতুন ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই। অর্থাৎ প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ কতটুকু হবে, তা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে।

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান হলো ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৬খ(১) ধারা। এই ধারায় একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, যা একক ঋণগ্রহীতার সীমা নামে পরিচিত। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক তার মোট মূলধনের (পেইড-আপ ক্যাপিটাল ও রিজার্ভসহ) সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত একটি ব্যক্তি বা গ্রুপকে ঋণ দিতে পারে। এর মধ্যে সাধারণত ১৫ শতাংশ সরাসরি ঋণ (নগদ) এবং অতিরিক্ত ১০ শতাংশ নন-ফান্ডেড সুবিধা (যেমন এলসি বা ব্যাংক গ্যারান্টি) হিসেবে দেয়া যায়। এই সীমা নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হলো একক গ্রাহকের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানো এবং ব্যাংকের ঝুঁকি কমানো। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বড় করপোরেট গ্রুপগুলো ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে পরবর্তীতে খেলাপি হলে পুরো ব্যাংকই ঝুঁকিতে পড়ে। এই বাস্তবতা থেকেই ২৬খ(১) ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে কিছু প্রভাবশালী গ্রুপের কাছে বিপুল পরিমাণ ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, সেখানে এই বিধান আরো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দামের ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে এলসি খোলা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে এলপিজি আমদানিতে বিঘœ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে দেশের রান্নার গ্যাসের একটি বড় অংশ এখন এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমদানিকারকরা সহজে ব্যাংক ঋণ পেয়ে এলসি খুলতে পারবেন এবং বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণসীমা শিথিল করা হলেও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। কারণ একক কোনো গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত হলে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নতুন ঊর্ধ্বসীমা এবং তদারকি কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। সার্বিকভাবে, এলপিজি আমদানি সহজতর করা এবং সরবরাহ চেইন সচল রাখতেই এই বিশেষ নীতিগত সুবিধা দেয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এ সুবিধা বহাল থাকায় বাজারে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।