ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বি-১ বোমারু বিমান

হরমুজ নিয়ে তেহরানের অবস্থানে পরিবর্তন নেই

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ল্যবস্তুতে হামলা চালাতে প্রথমবারের মতো বি-১ দূরপাল্লার বোমারু বিমান ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। গত মঙ্গলবার এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে হামলা হয়।

ইরানের সাথে ১২ দিন আগে পুনরায় শুরু হওয়া সঙ্ঘাতের পর এই প্রথম বি-১ বোমারু বিমান দিয়ে অভিযান চালাল যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, দুই হাজার পাউন্ডের ২৪টি বোমা অথবা কয়েক ডজন ক্রুজ পেণাস্ত্র বহনে সম এই বোমারু বিমান ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং সঙ্ঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। বি-১ বোমারু বিমান নিম্ন উচ্চতায় শব্দের গতির চেয়েও বেশি গতিতে উড়তে পারে এবং যেকোনো ধরনের বোমারু বিমানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বোমা বহনের সমতা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ক্রমাগত জোরদারের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ পরিসরের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, কয়েক দিনের মধ্যেই এমন অভিযান শুরু হতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, বি-১ বোমারু বিমানটি ব্রিটেনের একটি বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। অনলাইন বিমান চলাচল পর্যবেণকারী ওয়েবসাইটগুলোতেও বিমানটির গতিবিধি শনাক্ত করা হয়। তবে মঙ্গলবারের হামলা নিয়ে দেয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বি-১ বোমারু বিমানের এই অভিযানের কথা উল্লেখ করেনি।

সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের বাহিনী ইরানের সামরিক অভিযান পরিচালনাকেন্দ্র, সামুদ্রিক সমতা, বিমান হ্যাঙ্গার, ড্রোন সংরণাগার এবং সামরিক রসদ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করার ইরানের সমতাকে আরো দুর্বল করা যায়। তবে বি-১ বোমারু বিমানটি ঠিক কোনো ল্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সাম্প্রতিক কয়েক দিনের অন্যান্য হামলার তুলনায় এই বৃহৎ অভিযান কতটা বেশি কার্যকর ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে অপারেশন এপিক ফিউরি চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক বি-১ অভিযান পরিচালনা করেছিল। ওই অভিযানে পেণাস্ত্র ঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার, অস্ত্রভাণ্ডার এবং আকাশ প্রতিরা ব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়।

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিধি বাড়লেও হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানি সরকারের অবস্থানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। একই সাথে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপরও ইরান হামলা অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন প্রতিরা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, হরমুজ প্রণালীর আশপাশে ইরানের সামরিক সমতা ‘প্রায় অস্তিত্বহীন’ হয়ে পড়েছে। তবে অন্য কর্মকর্তাদের মতে, ওই এলাকায় জাহাজে হামলা চালানোর সমতা ইরানের এখনো রয়েছে।

বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরান যদি আরো জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালানো হবে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোকে ল্যবস্তু করার হুমকি দেয় ইরান।

একই দিন ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বন্দর অবরোধের ঘোষণা দেয়ার পর প্রথমবারের মতো সৌদি জাহাজে হামলা চালায়। এক মার্কিন প্রতিরা কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় পুরোপুরি এই যুদ্ধে অংশ না নেয়ার পর হাউছিদের এই হামলার পেছনে ইরানের প্রভাব থাকতে পারে। তার ভাষ্য, ইরান হাউছিদের ব্যবহার করে উপসাগরের পাশাপাশি লোহিত সাগরেও নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট খুলতে চায় এবং আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়।

বুধবার লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজকে হুথি হামলার আশঙ্কায় বাব আল-মান্দেব প্রণালী এড়িয়ে বিকল্প পথে চলতে দেখা গেছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর বরাতে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া এবং সঙ্ঘাত বন্ধে নতুন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ল্েয কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা এখনো যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ওমানের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

একটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের সর্বশেষ প্রস্তাবটি এখনো ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রহণ করেনি। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কতদিন সময় দেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বুধবার রাতে জর্জিয়ায় এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা এত কঠোরভাবে আঘাতের মুখে পড়েছে যে এখন তারা একটি চুক্তি করতে চায়।’ তবে তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু আমি বলি, তারা এখনো চুক্তির জন্য প্রস্তুত নয়। কারণ তারা যখনই কোনো চুক্তি করে, তখনই সেটি পরিবর্তন করতে চায় এবং নানা কিছু করতে চায়। তারা এখনো প্রস্তুত নয়। খুব শিগগিরই তারা প্রস্তুত হবে।’

সিআইএ স্থাপনায় ইরানের হামলায় রাশিয়ার সম্পৃক্ততা!

এ দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলা হয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলার ল্য নির্ধারণে রাশিয়া তথ্য (টার্গেটিং ডাটা) অথবা উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চার ব্যক্তি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা এসব সূত্র জানিয়েছে, হামলায় রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তবে হামলার কার্যকারিতা, নিখুঁত ল্যভেদ এবং ইরানের প্রতি রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সহায়তাকে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এর আগে জানিয়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ল্যবস্তুর বিরুদ্ধে ইরানের হামলায় রাশিয়া ল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছে। তবে সিআইএর স্থাপনাগুলোর ওপর হামলায় রাশিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায় যে আলাদা তদন্ত করছে, তা আগে প্রকাশ করা হয়নি।

রয়টার্স ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, মার্চ মাসে অন্তত দু’টি সিআইএ স্থাপনায় হামলা হয়। এর একটি ছিল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে অবস্থিত সিআইএ স্টেশন এবং অন্যটি ছিল পূর্ব ইরাকে অবস্থিত একটি পৃথক সিআইএ স্থাপনা। কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, আরো কয়েকটি সিআইএ স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে, তবে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি।

একটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ স্মারকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সিআইএ স্থাপনাগুলোকে ল্যবস্তু করতে রাশিয়া সম্ভবত ভূমিকা রেখেছে। নথিটিতে প্রবেশাধিকার থাকা ওই অঞ্চলের এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানালেও স্মারকটির প্রণেতার পরিচয় প্রকাশ করেননি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা গোয়েন্দা রিপোর্ট সম্পর্কে ব্রিফিং পেয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, বিশ্লেষকদের ধারণা সৌদি আরবে হামলায় ইরানের শাহেদ ড্রোনের রাশিয়া-উন্নত দু’টি সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের মতে, একটি ড্রোন দূতাবাস ভবনের বাইরের অংশের একটি দুর্বল স্থানে গর্ত সৃষ্টি করে এবং দ্বিতীয় ড্রোনটি সেই গর্ত দিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে বিস্ফোরিত হয়। এ হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।