নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- পশ্চিমতীরে মসজিদে আগুন
- গাজায় মাথার খুলি ও নারীদের বিকৃত দেহ পাঠিয়েছে ইসরাইল : করবিন
- গাজা ও পশ্চিমতীরে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিল
ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্রসংগঠন হামাস অস্ত্র না ছাড়লে পুরো গাজা দখল করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। হামাস অস্ত্র সমর্পণের ইসরাইলি আলটেমেটাম প্রত্যাখ্যানের প্রেক্ষিতে সোমবার তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। খবর আরব নিউজের।
গত সপ্তাহে ইসরাইল হুঁশিয়ারি দেয়, ৬০ দিনের মধ্যে হামাস অস্ত্র সমর্পণ না করলে গাজায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হবে। ইসরাইলের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োসি ফুচস জেরুসালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, হামাসকে ৬০ দিনের মধ্যে সব অস্ত্র, এমনকি একে-৪৭ সমর্পণ করতে হবে। মার্কিন প্রশাসন এই সময়সীমার জন্য অনুরোধ করেছিল বলেও জানান তিনি। তারা অস্ত্র সমর্পণ না করলে নতুন করে ইসরাইলি বাহিনী (আইডিএফ) সামরিক অভিযানে নামবে বলেও হুমকি দেন তিনি।
তবে ইসরাইলি সরকারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস। হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাবি বলেন, ‘ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেয়া বিবৃতিগুলো কেবলই হুমকি। চলমান আলোচনায় এর কোনো ভিত্তি নেই।’ এরপর হামাসকে আবারো হুঁশিয়ার দেয়া হলো। সোমবার বেজালেল বলেন, হামাসকে খুব শিগগিরই অস্ত্র সমর্পণের জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা দেয়া হতে পারে। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হামাসকে গাজা পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণের আলটিমেটাম দেয়া হতে পারে। হামাস যদি তা না মানে, তাহলে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী নিজেরাই ব্যবস্থা নেবে।’ স্মোট্রিচ বলেন, ‘হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি না হলে ইসরাইলি বাহিনী অবশ্যই গাজায় ঢুকে এলাকা দখল করবে।’ কিভাবে অভিযান চালানো হবে, সে বিষয়ে দুই বা তিনটি পরিকল্পনা বিবেচনায় আছে বলে জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় ২০ হাজার সদস্যের একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ বাহিনীতে কয়েকটি দেশ সেনা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ বিষয়ে স্মোট্রিচ বলেন, বিদেশী সেনারা মোতায়েন থাকলেও ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালাতে চাইলে তারা দ্রুত সরে যাবে। এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় করেই করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে তিনি বলেন, আপাতত আন্তর্জাতিক বাহিনী দ্রুত গাজায় ঢুকবে বলে মনে হচ্ছে না।
পশ্চিমতীরে মসজিদে আগুন
পবিত্র রমজান মাসেও ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিমতীরের একটি মসজিদে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলের অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা। সোমবার তারা মসজিদের দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগান লিখে আগুন দিয়েছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, উত্তর পশ্চিমতীরের নাবলুসের কাছে সাররা ও তাল গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত আবু বকর আস-সিদ্দিক মসজিদে এ হামলা চালানো হয়। এপির খবর অনুযায়ী, ভোরে ফজরের নামাজ পড়তে এসে মুসল্লিরা মসজিদের প্রবেশদ্বারে ধোঁয়া ও আগুনের চিহ্ন দেখতে পান।
মসজিদের পাশেই মুনির রামদানের বাড়ি। তিনি বলেন, ‘আমি দরজা খুলে স্তম্ভিত হয়ে যাই। সেখানে আগুন জ্বলছিল, কাচ ও দরজা ভাঙা ছিল।’ মুনির আরো বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুই ব্যক্তি পেট্রল ও স্প্রে পেইন্ট নিয়ে মসজিদের দিকে যাচ্ছে এবং কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে দৌড়ে পালাচ্ছে। হামলাকারীরা মসজিদের দেয়ালে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য এবং ‘প্রতিশোধ’ ও ‘প্রাইস ট্যাগ’ শব্দগুলো লিখে রেখে যায়। গাজা উপত্যকার পাশাপাশি পশ্চিমতীরেও ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা অব্যাহত সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনা ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত এক হাজার ৯৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করার এসব কর্মকাণ্ড ‘জাতিগত নিধনের’ শামিল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত বছর পশ্চিমতীরে মোট ৪৫টি মসজিদে হামলা হয়েছে। এদিকে দখলকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের দমন-উচ্ছেদ নীতি আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। মঙ্গলবার রামাল্লাহর পশ্চিমে বেইত লিকিয়া শহরে ইসরাইলি সেনারা তিনটি বসতঘর ও একটি কৃষিস্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেনারা এলাকায় ঢুকে অনুমতিবিহীন নির্মাণের অজুহাতে এসব স্থাপনা ধ্বংস করে। রমজান মাসের সপ্তম দিনে এই অভিযান চালানোয় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ফিলিস্তিনের ওয়াল ও বসতি প্রতিরোধ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারি মাসেই ইসরাইল ৫৯টি ধ্বংস অভিযান চালিয়ে ১২৬টি ফিলিস্তিনি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যার মধ্যে ৭৭টি ছিল বসবাসযোগ্য ঘর। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পশ্চিমতীরে সহিংসতা বেড়েছে। ফিলিস্তিনি হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, প্রায় ১১ হাজার ৫০০ আহত এবং প্রায় ২২ হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে হামাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছে। পশ্চিমতীরে জমি ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ হিসেবে নিবন্ধন ও বসতি সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপকে তারা অবৈধ সংযুক্তীকরণের অংশ বলে উল্লেখ করেছে। প্রায় ২০টি দেশ ইসরাইলের এসব উদ্যোগের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এগুলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখল অবৈধ ঘোষণা করে সব বসতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও বাস্তবে দমননীতি আরো জোরদার হচ্ছে বলে অভিযোগ ফিলিস্তিনিদের।
গাজায় মাথার খুলি ও নারীদের বিকৃত দেহ পাঠিয়েছে ইসরাইল
গাজায় ইসরাইলি বাহিনী নিহত ফিলিস্তিনিদের মাথার খুলি ও বিকৃত দেহাবশেষ পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্রিটেনের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিন। তিনি জানান, গাজার আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক ডা: মোহাম্মদ আবু সালমিয়ার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৬৬টি বাক্সে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ পাঠানো হয়েছে। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের
করবিন বলেন, কিছু নারীর দেহে অস্ত্রোপচারের চিহ্ন রয়েছে, যা থেকে অঙ্গ অপসারণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মাধ্যমে দেহাবশেষ হস্তান্তর করা হলেও সেগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনে যা ঘটছে, তা আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কট। লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে অংশ নিয়ে করবিন বলেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিবাদ করা কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি নৈতিক দায়িত্ব।
গাজা ও পশ্চিমতীরে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিল
মার্কিন কংগ্রেস সদস্য শন ক্যাস্টেন গাজা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে একটি বিল উত্থাপন করেছেন। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, ভূমি সংযুক্তীকরণ বা বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা চললে ইসরাইল মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের।
বিলে বলা হয়েছে, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার অক্ষুণœ রেখেই যুদ্ধবিরতি রক্ষা ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
বিলটির সহউত্থাপক হিসেবে কংগ্রেসের একাধিক প্রগতিশীল সদস্য সমর্থন দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
ভারী বৃষ্টিতে গাজায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু প্লাবিত
গাজা উপত্যকায় ভারী বৃষ্টিপাতে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের শত শত তাঁবু পানিতে তলিয়ে গেছে। ইসরাইলি হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ায় লাখো মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। বিশেষ করে রাফাহ ও খান ইউনুসের উপকূলীয় মাওয়াসি এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গাজার সিভিল ডিফেন্স জানায়, বহু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরসহ উত্তর ও মধ্য গাজায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় খাবার, কম্বল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা আহ্বান জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন সঙ্কটে, গাজার বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা
মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণাকার্যক্রমে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষকদের মতে, এর পেছনে ইসলামবিদ্বেষ ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে সমালোচনামূলক জ্ঞান দমনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়নে ব্যাপক অর্থায়ন হলেও, সেই গবেষণা থেকে সাম্রাজ্যবাদ ও দখলদারিত্বের সমালোচনা উঠে আসায় এখন উল্টো পথে হাঁটা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় চলমান গণহত্যার বাস্তব ইতিহাস জানার ভয়েই এই শিক্ষাক্ষেত্র সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক এই জ্ঞানচর্চাই আজকের ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। গবেষকদের সতর্কতা-সংলাপ ও অধ্যয়ন বন্ধ হলে বিশ্ব আরো অন্ধকারের দিকে যাবে।



