হাবিবুল বাশার
বাংলাদেশের কওমি ধারার শিক্ষার্থীদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ দাওরায়ে হাদিস ছাড়া বাকি স্তরগুলোর সরকারি স্বীকৃতি না থাকা। এর মধ্যেও প্রচলিত শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের ধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে এই বিশাল মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইটিনির্ভর পেশা এবং দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশ যাওয়ার হার আগের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে প্রতিবন্ধকতা দেখা যায় সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মাস্টার্স সমমান সার্টিফিকেট থাকার পরেও মিলছে না পছন্দ মতো সরকারি-বেসরকারি চাকরি এমনকি উচ্চশিক্ষা। বিশেষজ্ঞরা এ সমমানকে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে মনে করেন। স্তরক্রমটা বিন্যাস করা না হলে সমাধান মিলবে না বলে মন্তব্য করেন তারা। অন্য দিকে শিক্ষার্থীরা চায় সমাধানের পথ।
সরকার দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দিলেও সেটি কাজে লাগানোর সুযোগ খুবই কম। যেমন সরকারি চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন পদ্ধতিতে সিজিপিএ চাওয়া হয় কিন্তু মাদরাসা শিক্ষার্থীর ফলাফল সিজিপিএভিত্তিক না। সে জন্য সেখানে তাদের কোনো অপশনই নেই। তারপরও এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ দশমিক ১৭ শতাংশ সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নিযুক্ত। তাদের প্রায় ৪৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ মসজিদসহ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব বা শিক্ষকতায় নিযুক্ত এবং বাকিরা অন্যান্য পেশায়।
মাদরাসার সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী হতাশায় ভুগছেন। সরকার এবং মাদরাসার বোর্ড কর্তৃপক্ষের জটিলতার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জীবন বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। এসব জটিলতা থেকে বের হয়ে একটি সমাধানের মাধ্যমে সঠিক মূল্যায়নের দাবি জানান শিক্ষর্থীরা।
যাত্রাবাড়ীর জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া থেকে জালালাইন শেষ করে রাকিব পাড়ি জমান স্পেনে। তিনি বলেন, ব্যবসার প্রতি আগ্রহ থাকলেও সুযোগ করে উঠতে পারিনি। এখন স্পেনের একটি কোম্পানিতে কাজ করি। তার সহপাঠী অনেকেই বিদেশে, ব্যবসা, আউটসোর্সসিং করে বলে জানান তিনি।
ঢাকার জামিয়া মাদানীয়া নিজামিয়া থেকে দাওরায় হাদিস সম্পন্ন করা মাওলানা বুলবুল শাহ বলেন, সরকার দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দিলেও সেটি কাজে লাগানোর সুযোগ খুবই কম। যেমন সরকারি চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন পদ্ধতিতে সিজিপিএ চাওয়া হয় কিন্তু আমাদের ফলাফল সিজিপিএভিত্তিক না। আমাদের জন্য সেখানে কোনো অপশনই নেই। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের অনলাইন মার্কেটিং হেড হিসেবে কাজ করছেন।
গোপালগঞ্জ আল-জামিআতুল ইসলামিয়া ইসলামপুর ভবানীপুর মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করা শিক্ষার্থী মাওলানা ফেরদাউস রায়হান আস-সুন্নাহ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেখানেই কাজ করেন। তিনি বলেন, সাধারণত কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’ সম্পন্ন করার পর মাস্টার্সের সমমান পেয়েও সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য নেই। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু পেশা ইমাম-মোয়াজ্জিন, বেসরকারি কওমি মাদরাসার শিক্ষকতা ছাড়া সরকারি বা বেসরকারি কোনো চাকরির সুযোগ নেই।
গ্রাফিকস ও মোশন গ্রাফিক্স সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, কারিগরি বা টেকনিক্যাল লাইনে কাজের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটের চেয়ে ব্যক্তিগত দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনে এমন কর্মী কাজ করছেন যারা মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা সত্ত্বেও তাদের কারিগরি দক্ষতার কারণে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে নিয়োগ পেয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রার্থীর কাজের যোগ্যতাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়, তার কী সার্টিফিকেট আছে তা নয়। এ ছাড়াও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সাথে এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ বা ‘লিয়াজোঁ’ আছে যারা দক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য কর্মী খুঁজছে। যেখানে মাদরাসা থেকে আসা দক্ষ জনবল কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, দাওরায়ে হাদিস মাস্টার্স ঘোষণা করা ছিল আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক প্রতারণা। অবশ্যই কওমি মাদরাসার জনশক্তিকে কাজে লাগানো দরকার। যারা ইসলামী ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসী এবং ইসলামী শিক্ষাকে ইসলামী কুরআন হাদিসকে রক্ষার জন্য তাদেরকে আমাদের অতি অবশ্যই সহযোগিতা করা দরকার। তার মানে এই নয় যে, ধারাবাহিকতা ছাড়া শূন্যভাবে তাদেরকে হঠাৎ করে ডিগ্রি দেয়া। কওমি মাদরাসার একটি বড় অংশ আছে তারা নিজেদেরকে ডিগ্রি বা রাষ্ট্রিক স্বীকৃতির অপেক্ষা রাখে না। এখন কওমি মাদরাসার এই জনশক্তিকে অবশ্যই বৃহত্তর শিক্ষায় জাতীয় জীবনের মূল ধারায় সংশ্লিষ্ট করা দরকার। সে কারণে দ্বিতীয় দু’টি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একটি হলো স্তরক্রমটা বিন্যাস করা যেমন, এসএসসি, এইচএসসি, ইন্টারমিডিয়েট, অনার্স, মাস্টার্স এইভাবে স্তরক্রম নির্ণয় করা। এবং সেখানে পরিপূর্ণভাবে মানে জাগতিক লেখপড়াকেও গুরুত্ব দেয়া। এখন দাওরায়ে হাদিস পাস করে যদি সে অফিস চালাতে না পারে বা যদি বাংলা ইংরেজি না বলতে পারে তাও মুশকিল। অন্য ধারণাটি হচ্ছে যে, যদি এই স্তরক্রম করা হয় বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান ইত্যাদি ঢুকিয়ে দেয়া হয় তাহলে পরে মাদরাসার ধারাক্রম বা যেভাবে ট্রাডিশনালি যেভাবে চলে আসছিল সেটা ব্যাহত হয়। তারা সবসময় সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন থাকতে চেয়েছে। সরকারের সাহায্য সহযোগিতা তারা কখনো নেয়নি। এ ধারাটা স্বাধীনভাবে স্বকীয়ভাবে স্বতন্ত্রভাবে যদি অব্যাহত থাকে তাহলেও পরেও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
এ দিকে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অফিস ব্যবস্থাপক মু: অছিউর রহমান বলেন, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্সের কাঠামোর বিষয়টা নিয়ে আমাদের কমিটির সাথে সরকারের এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। অন্য একটা বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগে যাওয়ায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল। আলোচনায় নিচের দিকের তিনটা স্তর কাফিয়া জামাত (এসএসসি সমমান), শরহে বেকায়া (এইচএসসি সমমান), মেশকাত (ফজিলত ডিগ্রি সমমান) তারা এভাবে এটা চিন্তা করছে। তবে যদি আমরা এই বিষয়ে সহমত পোষণ করি তাহলে সিলেবাস পর্যালোচনা কমিটি তারা গঠন করবে এবং সেখানে শর্ত থাকবে কারিগরির লেভেল ওয়ান থেকে লেভেল সিক্স পর্যন্ত কোর্সগুলো আমাদের মাদরাসায় করাতে হবে। এগুলোর পরীক্ষাও দিতে হবে। আর সমমান কার্যকর হওয়ার পরে শিক্ষাধারা পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ কাফিয়া এটা পাস করার পরে কেউ চাইলে আবার ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হতে পারবে। আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হতে পারবে। এই ধরনের শিক্ষা দ্বারা পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। তো এটা ওই মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের কমিটির সাথে নিচের তিন স্তরের সমমান এবং স্বীকৃতি নিয়ে কমিটির সাথে সরকারের বা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ের কোনো বৈঠক হয়নি।
তারা কয়েকবার বৈঠকের জন্য আমাদেরকে ডেকেছিল। মিটিং তারিখও দিয়েছিল কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের কমিটির সদস্যরা যাননি। কারণ আমাদের এই নিচের তিন স্তরের সমমান সরকার থেকে স্বীকৃতি নেয়ার কমিটির পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
এ বিষয় ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, কওমি মাদরাসার মাস্টার্স সমমান সার্টিফিকেট এটা তো আউট অফ নাথিং। এসএসসি, ইন্টারমিডিয়েট বা আন্ডারগ্রেড কোনো কিছুর সার্টিফিকেট নাই, শুধু মাস্টার্সের একটা সার্টিফিকেট আছে। উচ্চ শিক্ষা বা জব বা ক্যারিয়ার কোথাও তারা অ্যাপ্লাই করতে পারে না। উল্টা হওয়া উচিত ছিল। আলিয়া মাদরাসার ক্ষেত্রেও যেটা ধাপে ধাপে হয়েছে প্রথমে এসএসসি এবং এইচএসসি এইটার সমমান দিয়েছে, তারপরে আস্তে আস্তে অনেক দিন পরে সে ডিগ্রি মাস্টার্সের সমমান দিয়েছে কামিলকে। কিন্তু এখন কওমিতে ক্রাইসিস হচ্ছে হঠাৎ করে একটা মাস্টার্স সার্টিফিকেট আছে কিন্তু আগের কোনো কিছুর সার্টিফিকেট নাই।
তিনি বলেন, সোজাসোজি বলতে গেলে এটা একটা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। তাদেরকে এক ধরনের ‘মিথ্যা সান্ত¡না’ দেয়ার জন্য সমমান ডিগ্রি দেয়া হয়েছে। যেটা আসলে কোনো ভিত্তি নাই। উচিত ছিল যে প্রথমে হাইস্কুল মানে ক্লাস ফাইভ, ক্লাস এইট বা এসএসসি ইকুইভ্যালেন্ট ডিগ্রি দেয়া। তারপরে ইন্টারমিডিয়েট ইকুইভ্যালেন্ট ডিগ্রি দেয়া। উচ্চশিক্ষার জন্য দিলে সেটা আরেকটু পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে দেয়া যেত আন্ডার গ্র্যাজুয়েট এবং মাস্টার্স। এটাই হচ্ছে মূল ক্রাইসিস যে এই ডিগ্রির আসলে কোনো ভ্যালু নাই।



