রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পারমাণবিক বিরোধ সমাধানের লক্ষ্যে জেনেভায় পরোক্ষ বৈঠকে বসেছেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ঘিরে ওয়াশিংটনের ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতির মধ্যে আপসের তেমন স্পষ্ট ইঙ্গিত ছাড়াই গতকাল মঙ্গলবার দুইপক্ষ এ বৈঠকে বসেছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় পর্বের এ বৈঠকে মার্কিন পক্ষে অংশ নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এক সূত্র রয়টার্সকে এমনটি জানিয়েছে। আর ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি।
তেহরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলা বিরোধ নিরসনে ওমানের মধ্যস্থতায় ওমানে ৬ ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের বিশ্বাস, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়। ইরান সত্যিই পারমাণবিক শক্তি হয়ে উঠলে তা ইসরাইলের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলতে পারে।
ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশে নিবেদিত। তবে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে আর বোমা বানানোর জন্য যে পরিমাণ প্রয়োজন তার কাছাকাছি রয়েছে। গত বছর জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারমাণবিক বিরোধ নিয়ে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক বোমাবর্ষণ অভিযান চালায়, এতে দুইপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর একপর্যায়ে তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা দিয়ে হামলা চালায়। এবার সে ধরনের সম্ভাবনা এড়াতে তেহরান অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই হামলার পর থেকে তেহরান বলে আসছে, তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। অবশ্য তারপর থেকে ইরানের শাসকরা দেশব্যাপী ব্যাপক প্রতিবাদ ও জনবিক্ষোভের কারণে অনেকটা দুর্বল হয়েছে। ইরানের ওপর আরোপ করে রাখা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল রফতানি থেকে দেশটির আয় কমে গেছে আর এটি জীবনযাত্রার ব্যয় সঙ্কট তৈরি করেছে। এই মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদেই দেশটির জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছিল। শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভ দমন করা সম্ভব হলেও কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের জলসীমায় ব্যাপক নৌ-শক্তির সমাবেশ ঘটিয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম বাড়িয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েছে। ওয়াশিংটন আলোচনার সূচিতে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের পাশাপাশি দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তেহরান শুধু তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ ও এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় নিয়ে আলোচনা করবে বলে জানিয়েছে। তারা আরো জানিয়েছে, তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে পুরোপুরি সরে আসবে না আর ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও কোনো আলোচনা করবে না। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুদাপেস্টে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ইরানের সাথে চুক্তি করা কঠিন; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করবে।
বৈঠক বিফলে গেলেই যুদ্ধ শুরু
এদিকে মার্কিন এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রস্তাবে ইরানের রাজি হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। এর আগে সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ট্রাম্পকে একই কথা বলেছেন। তিনি ট্রাম্পকে জানান, ইরানের সাথে ভালো একটি চুক্তি সম্পন্ন করা অসম্ভব। বেনিয়ামিন দাবি করেন, যদি চুক্তি হয়েও যায় ইরান এই চুক্তি মেনে চলবে না।
ট্রাম্প বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েই যাচ্ছেন যে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে চুক্তি না করলে ইরানে হামলা অনিবার্য। এমন পরিস্থিতির মধ্যে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। খবরে বলা হয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য কয়েক সপ্তাহব্যাপী অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দেয়া মাত্রই মার্কিন বাহিনী অভিযান শুরু করবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দু’জন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
পরিকল্পনার সংবেদনশীলতার কারণে ওই দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করেনি। এ ছাড়া এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান কূটনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে আরো বিমানবাহী রণতরী ছাড়াও হাজার হাজার সেনা পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া যুদ্ধবিমান, গাইডেড-মিসাইল ডেসট্রয়ার এবং অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র পাঠানো হচ্ছে। ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, তেহরানের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে সব অপশন হাতে আছে।



