ওয়াইফাই সংযোগ কি শিশুর মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলে?

Printed Edition
ওয়াইফাই সংযোগ কি শিশুর মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলে?
ওয়াইফাই সংযোগ কি শিশুর মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলে?

ডা. আহাদ আদনান

প্রযুক্তির দুনিয়ায় আমরা একরকম বৈদ্যুতিক তরঙ্গ কিংবা বিকিরণের সমুদ্রে ডুবে থাকি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ, ওয়াইফাই, ডিশ সংযোগ এসব কিছুতেই বিকিরণ জড়িয়ে আছে। এগুলোর মধ্যে ওয়াইফাই ইদানীং অনেকের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বাসা, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যতক্ষণ বিদ্যুৎ আছে, এটাও চলতে থাকে। অর্থাৎ এর তরঙ্গ বিকিরণ থেকে আপনার রেহাই নেই। কিন্তু এটা কি ক্ষতিকর? বিশেষ করে বাড়ন্ত শিশুদের জন্য?

শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ গর্ভাবস্থা থেকে শুরু হয়ে যায়। জন্মের প্রথম পাঁচ বছর এটি সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়। এই সময়ে তার জন্য খাবার, পরিবেশ, আচরণ, ওষুধ, বিকিরণ প্রতিটি জিনিস বিবেচনায় আনতে হয়। যেহেতু এই সময়টায় তার মাথার খুলি থাকে পাতলা আর মস্তিষ্ক এবং স্নায়ু কোষ বাড়তে থাকে তাই অনেক বিজ্ঞানি ধারণা করছেন আশপাশের ওয়াইফাই সংযোগ বিকিরণ তার মস্তিষ্কের কোষে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার এসব বাচ্চারা মোবাইল ব্যবহারও করে মাথার খুব কাছাকাছি অবস্থানে রেখে।

বিজ্ঞান শুধু ধারণার উপর চলে না। তার চাই প্রমাণ। এখন পর্যন্ত ওয়াইফাইয়ের খুব ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিষ্ঠিত না হলেও সারা পৃথিবীতে এটা নিয়ে কিছু চমকপ্রদ ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। সতর্কতার জন্য আমরা এগুলো জেনে রাখতে পারি।

  • গর্ভবতী মায়েদের অতিরিক্ত ওয়াইফাই সংযোগে অবস্থান এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার বাচ্চাদের অতিরিক্ত চঞ্চলতা কিংবা আচরণগত সমস্যা করতে পারে।
  • এসব বিকিরণ স্নায়ুতন্ত্র এবং রক্তের মধ্যকার পর্দা (ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ার) দুর্বল করে দেয়। ফলে অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের ভেতরে প্রবেশ সহজ হয়ে যায়।
  • ওয়াইফাই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো থেকে দিন-রাতের ঘুমের স্বাভাবিক অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ, আপনার শিশুর ঘুম কমে যাবে, অথবা রাত জেগে দিনে ঘুমাবে। এছাড়া এসব শিশুর ক্ষুধামন্দা অথবা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা, খিটখিটে, অসামাজিক, সহজেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলতে দেখা গেছে।
  • বিকিরণের ক্ষতি উৎসের দূরত্ব এবং স্থায়িত্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ, ওয়াইফাই সংযোগের উৎস আপনার ঘুমের/ কাজের ঘরের যত কাছাকাছি হবে এবং আপনি যত বেশি সময় ধরে এর মধ্যে থাকবেন, আপনার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।
  • বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের ওপর নিরীক্ষা চালিয়েছেন। মোবাইল সংযোগ ইঁদুরের গর্ভের মস্তিষ্কে ক্ষতিকর ক্রিয়া করে স্মরণশক্তি এবং আচরণগত ক্ষতি করে।
  • ইঁদুরের ওপর আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চমাত্রার দীর্ঘকালীন তরঙ্গ স্নায়ু কোষের ক্ষয় করতে থাকে।
  • এখনই এসব তথ্য নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে যারা এসব ফলাফল নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তা করবেন তাদের জন্য কিছু পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।
  • রাতে ঘুমানোর সময় বাসার ওয়াইফাই সংযোগ বন্ধ রাখা যায় কিনা দেখুন। একাধিক মোবাইল থাকলে কম জরুরি স্মার্টফোন ফ্লাইট মুড/বন্ধ রাখতে পারেন। ওয়াইফাই সংযোগের চেয়ে তার সংযোগ কম ক্ষতিকর।
  • শিশুর হাতে যখনতখন মোবাইল, ট্যাব দেবেন না। যখন দেবেন তখন ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রেখে দেবেন। তাকে মনিটর ব্যবহারের সময় বেঁধে দেবেন। সে ঘুমালে তার মাথার আশপাশে মোবাইল রাখবেন না।
  • বাসায় ওয়াইফাই সংযোগ শোয়ার ঘর থেকে সর্বোচ্চ দূরে রাখতে পারেন। এখানেও অতিরিক্ত গতি আপনার বিপদের কারণ হতে পারে।
  • গর্ভবতী মায়েদের যেকোনো বিকিরণ, তরঙ্গ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।
  • এসব তথ্যের ওপর সারা পৃথিবীতে প্রচুর গবেষণা এখনো চলমান। এগুলোকে তাই প্রতিষ্ঠিত তথ্য বলা যাবে না। তবে যেসব গবেষণা ওয়াইফাইকে নিরীহ বা ক্ষতিকর নয় বলছে, তাদের তুলনায় এটাকে ক্ষতিকর প্রমাণিত গবেষণা অনেক বেশি। আর যেকোনো বয়সের মানুষের মধ্যে এই ক্ষতিতে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে শিশুদের।

লেখক : শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, আইসিএমএইচ, মাতুয়াইল ঢাকা