জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন

Printed Edition

মুফতি নূরুল্লাহ হাশেম

আল্লাহ তায়ালা কিছু সময়কে অন্য সময়ের ওপর, কিছু দিনকে অন্য দিনের ওপর এবং কিছু মাসকে অন্য মাসের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। মুমিনরা যাতে এ দিনগুলোতে ফজিলত অর্জন করে তাদের আমলের স্পৃহা বৃদ্ধি করতে পারেন এবং যাতে করে অন্য দিনগুলোতে আমল করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। আল্লাহ তায়ালা মাসগুলোর মধ্যে চারটি মাসকে সম্মানিত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ মাসগুলো হলো : রজব, জিলকদ, জিলহজ ও মহররম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে মাসগুলোর গণনা ১২ মাস আল্লাহর কিতাবে, যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এর মধ্য থেকে চারটি হলো সম্মানিত’। (আল কুরআন, ৯:৩৬)

রমজান মাসের শেষ দশকের রজনী যেমন শ্রেষ্ঠতম তেমনি জিলহজ মাসের প্রথম দশকের দিবসগুলো বছরের শ্রেষ্ঠতম। মাসরুক (রহ:) বলেন, ‘জিলহজ মাসের প্রথম দশক বছরের শ্রেষ্ঠ দিবস’। (তাফসিরে সা’লাবি) এ দিনগুলোর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আল্লাহ কুরআনে কারিমে শপথ করে বলেন, ‘প্রত্যুষের শপথ এবং শপথ দশ রজনীর।’ (আল কুরআন ৮৯:১-২) ইমাম মুজাহিদ, কাতাদাহ, যাহহাক প্রমুখ মুফাস্সির দশ রজনী দ্বারা জিলহজ মাসের প্রথম দশককে বোঝানো হয়েছে বলে অভিমত পেশ করেন।

এ দিনগুলোর ফজিলতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, এ দিনগুলোতে এমন সব ইবাদত একত্রিত হয় যা অন্য দিনগুলোতে একত্রিত হওয়া অসম্ভব। যেমন এতে রয়েছে আরাফার রোজা, কোরবানি করা এবং ইসলামের অন্যতম রুকন হজ পালন করা। রমজান মাসের শেষ দশকের সাথে তুলনা করলে যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয়, তা হলো : রমজানের শেষ দশকের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ হলো তাতে রয়েছে শবেকদর; যে রজনীতে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর মানুষের পাপ মোচন করে পরবর্তী এক বছরের ভালো-মন্দ ভাগ্যলিপি নির্ধারণ করেন। অন্য দিকে জিলহজ মাসের প্রথম দশকে রয়েছে হজ যা মানবজাতিকে পাপ থেকে নিষ্কলুষ করে দেয়, আবার এ দশকে রয়েছে আরাফাহ দিবস যার রোজা পালনে পরবর্তী ও পূর্ববর্তী এক বছরের পাপ থেকে মুক্তির আশা করা যায়। হজরত আবু কাতাদা রা: থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সা: বলেন : ‘আরাফাহ দিবসের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহগুলো মার্জনা করে দেবেন।’ (তিরমিজি : ৭৪৭) হজরত আয়িশা রা: থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, নবী সা: বলেছেন : ‘আরাফাহ দিনে অধিকসংখ্যক বান্দাকে আল্লাহ তায়ালা দোজখ থেকে মুক্তি দান করেন’ (মুসলিম : ৩১৭৯)

ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হলো, রমজানের শেষ দশক উত্তম নাকি জিলহজের প্রথম দশক উত্তম? তিনি উত্তরে বলেন, জিলহজ মাসের প্রথম দশকের দিবসগুলো রমজানের শেষ দশকের দিবসগুলো থেকে উত্তম এবং রমজানের শেষ দশকের রজনীগুলো জিলহজের প্রথম দশকের রজনী থেকে উত্তম। (আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি, দুরুস ও ফাদ্বায়িল)

মোল্লা আলি কারি রহ: বলেন : রমজানের শেষ দশক তার রাত্রিগুলোর দিকে লক্ষ্য করে উত্তম। কেননা তাতে রয়েছে লায়লাতুল কদর আর জিলহজের প্রথম দশক তার দিনের দিকে লক্ষ্য করে উত্তম কেননা তাতে রয়েছে আরাফাহ দিবস। (মিরকাতুল মাফাতিহ, ৪/১৪২৯)

হাদিস শরিফে এ দিনগুলোর তাৎপর্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা রয়েছে। নবী সা: এ দিনগুলোকে সর্বোত্তম দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে এ দিনগুলোর আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের আমল বেশি প্রিয় নয়। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? উত্তরে নবীজী সা: বললেন, ‘না’, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ যদি কোনো ব্যক্তি নিজের জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বের হন এবং সে কোনো কিছু নিয়ে ফিরে না আসেন।’’ (বুখারি : ৯৬৯)

আরেক বর্ণনায় এসেছে যা হজরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও প্রিয় হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশকে ইবাদত করা, সুতরাং তোমরা এ দিনগুলোয় বেশি করে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব ও প্রশংসা বর্ণনা করো। (তাবারানি, আল মুজামুল কাবির)। পূর্ববর্তী বুজুর্গরা এ দিনগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিয়োজিত থাকতেন। ইমাম দারেমি বলেন, সায়িদ ইবনে যুবায়ের রহ: এ দশকে প্রাণপণ ইবাদতে রত থাকতেন এবং তিনি বলতেন, তোমরা এ দশকে প্রদীপ না নিভিয়ে ইবাদত করতে থাকো।

আমরা সাধারণত রমজানের শেষ দশককে আমলের জন্য যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকি ততটুকু আমরা জিলহজ মাসের প্রথম দশকে আমল করা থেকে উদাসীনতা প্রকাশ করে থাকি। সুতরাং আমাদের অবশ্যই কর্তব্য যে, জিলহজ মাসের প্রথম দশককে গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত বান্দেগিতে রত থাকা। জিলহজের প্রথম তারিখ থেকেই জামাতে প্রথম তাকবিরের সাথে নামাজ আদায় করা। নিয়ত পরিশুদ্ধ করে কোরবানির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। সামর্থ্যবানরা হজ আদায় করা এবং বেশি বেশি দান-সাদকা করা। আরাফাহ দিবসে গুরুত্বের সাথে রোজা পালন করা। অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং জিকিরে মশগুল থাকা। যথাসাধ্য ভালো কাজের আদেশ এবং খারাপ কাজের নিষেধ করা। তাহাজ্জুদের নামাজ ও অন্যান্য নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করা। সর্বাবস্থায় গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা।

লেখক : মুহাদ্দিস ও এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়