২ মিনিটের কথা বলে আর ফেরেনি সমুদ্র

বিচারের অপেক্ষায় একটি পরিবারের ২ বছর

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

‘মা, দুই মিনিট পরে আসছি।’

মাত্র চারটি শব্দ। একটি সাধারণ আশ্বাস। কিন্তু সেই ‘দুই মিনিট’ আজও শেষ হয়নি।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার দুপুরে মাকে দেয়া ওই শেষ কথাটিই আজও কানে বাজে মাসুদা জামানের। এরপর আর কখনো ঘরের দরজা ঠেলে ঢোকেনি তার ১৭ বছরের ছেলে মোস্তফা জামান সমুদ্র। রাজধানীর রামপুরায় আন্দোলনের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে সেদিনই থেমে যায় তার জীবন। পরদিন ছিল সিদ্ধেশ্বরী কলেজে ভর্তির দিন। নতুন বই, নতুন বন্ধু আর নতুন স্বপ্নের পথে হাঁটার কথা ছিল। কিন্তু ভর্তি ফরম হাতে নয়, সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় তাকে ফিরতে হয়েছিল গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সময়ও যেন এই পরিবারের ক্ষত শুকাতে পারেনি। সমুদ্রের বাবা-মা আজও অপেক্ষা করছেন- বিচারের, সত্য উদ্ঘাটনের এবং সন্তানের আত্মত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির। তাদের অভিযোগ, শোকের ভার বইতে বইতে এখন উল্টো নানা কটু কথা ও হয়রানিরও শিকার হতে হচ্ছে।

শেষ দেখা, শেষ কথা

১৯ জুলাইয়ের আগের দিন আন্দোলনে গিয়ে সমুদ্রের ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে ছররা গুলি লেগেছিল। বাবা মনিরুজ্জামান তাজল ভেবেছিলেন, এবার হয়তো ছেলে ঘরে থাকবে। কিন্তু সমুদ্রের উত্তর ছিল ছোট্ট- ‘কিছু হবে না।’

সেদিন সকালেও বাবা-ছেলে একসাথে বাসা থেকে বের হন জুমার নামাজ পড়তে। নামাজ শেষে বাবা ফিরে এলেও সমুদ্র জানায়, বন্ধুদের সাথে দেখা করে একটু পরই ফিরবে।

বেলা ২টা ২৫ মিনিটে মা ফোন করে বলেন, ‘বাসায় এসে ভাত খাও।’

ওপাশ থেকে ভেসে আসে সেই শেষ বাক্য- ‘দুই মিনিট পরে আসছি।’

এরপর আর কোনো কথা হয়নি।

অপেক্ষার পর আসে দুঃসংবাদ

সমুদ্র ফিরছে না। সময় গড়াতে থাকে। উদ্বেগ বাড়ে। বাবা-মা একের পর এক ফোন করেন। একসময় ফোনটি ধরেন সমুদ্রের বন্ধু আরাফাত।

কাঁপা কণ্ঠে তিনি জানান, সমুদ্র গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাকে নেয়া হয়েছে রামপুরার ডেল্টা হাসপাতালে।

খাবার টেবিল ছেড়ে বাবা-মা ছুটে যান হাসপাতালের দিকে। চারদিকে তখন গুলির শব্দ, আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলা। কিন্তু সন্তানের খোঁজে ছুটে চলা দুই মানুষের কাছে সেদিন কোনো ভয়ই বড় ছিল না।

হাসপাতালে পৌঁছে তারা দেখেন, মেঝেতে খালি গায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে সমুদ্র। চিকিৎসকরা জানান, সব শেষ। শেষ আশায় তাকে বেটার লাইফ হাসপাতালে নেয়া হলেও সেখানেও একই উত্তর মেলে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বুলেট সমুদ্রের হাত ভেদ করে পাঁজরে ঢুকে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু হয়।

একজন বাবার অসহায় আর্তি ও কাফনের যাত্রা

ছেলের নিথর শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে বাবা মনিরুজ্জামান তাজল বারবার বলছিলেন- ‘ওর শরীর এখনো গরম... ওর হার্ট চলছে...’

কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে সেই আকুতি আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি ১৭ বছরের এক তরুণকে।

যে ছেলের দুই দিন পর কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল, তাকে সেদিন হাসপাতালের মেঝে থেকেই শেষ বিদায় জানাতে হয়েছিল পরিবারকে।

মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি পরিবারের দুর্ভোগ। অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় প্রথমে একটি ভ্যানে করে সমুদ্রের লাশ বাসায় নেয়া হয়। পরে রাতের দিকে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যপাড়ার গ্রামের বাড়িতে।

সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় সমুদ্রকে।

আজও বাবা স্মৃতির ভেতর ফিরে যান।

‘সিদ্ধেশ্বরী কলেজে ভর্তির জন্য ফরম এনে রেখেছিলাম। রোববার ছেলের ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবারই তাকে সাদা কাফনে মুড়িয়ে কবর দিতে হলো।’

বিচার চাই, প্রতিশোধ নয়

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শোকের সাথে বসবাস করছেন সমুদ্রের বাবা-মা। বড় ছেলে ও মেয়ে বিদেশে থাকেন। দেশে এই বৃদ্ধ দম্পতির একমাত্র সঙ্গী ছিল সমুদ্র।

এখন তাদের দিন কাটে ওষুধ, স্মৃতি আর অপেক্ষা নিয়ে।

সমুদ্রের বাবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজের জানা সব তথ্য তুলে ধরেছেন। কিন্তু তিনি এখনো জানেন না, কার গুলিতে তার ছেলে নিহত হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি ট্রাইব্যুনালেও বলেছি, আমি যা জানি, তাই বলব। এর বাইরে কিছু বলতে পারব না। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, রাষ্ট্র তাদের খুঁজে বের করুক। প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হোক- এটাই আমার দাবি।’

৭০ বছর পেরোনো এই বাবা আরো বলেন, ‘আমি হার্টের রোগী, আমার স্ত্রীও অসুস্থ। আমাদের আর হারানোর কিছু নেই। আমি প্রতিশোধ চাই না, আমি ন্যায়বিচার চাই।’

পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও দায়

সমুদ্রের পরিবারের দাবি, শুধু তাদের সন্তানের নয়, জুলাই আন্দোলনে নিহত প্রত্যেক মানুষের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। কারা গুলি চালিয়েছিল, কিভাবে এসব মৃত্যু ঘটেছিল এবং কারা দায়ী- রাষ্ট্রকে তার পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে।

কারণ, তাদের বিশ্বাস- বিচার শুধু একটি পরিবারের ক্ষত কিছুটা উপশম করতে পারে না; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিকেও অর্থবহ করে তোলে।

সমুদ্র আর কোনো দিন ফিরবে না। কিন্তু তার মায়ের কাছে ‘দুই মিনিট পরে আসছি’ বাক্যটি আজও যেন শেষ না হওয়া এক অপেক্ষার নাম। সেই অপেক্ষা এখন শুধু সন্তানের জন্য নয়- সত্যের জন্য, বিচারের জন্য এবং এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য, যেখানে আর কোনো মাকে সন্তানের শেষ কথাকে সারা জীবনের স্মৃতি করে বাঁচতে হবে না।