- অনলাইন জুয়ার ‘গোপন অর্থনীতি’
- মাসে জুয়ার অবৈধ লেনদেন হয় ২০০০ কোটি টাকার বেশি
- প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অনলাইন জুয়ার সাথে যুক্ত
প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে দেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে অবৈধ অনলাইন জুয়া বা বেটিং। এটি এখন দেশের মূল অর্থনীতির সমান্তরালভাবে একটি বিশাল ‘গোপন অর্থনীতি’ বা শ্যাডো ইকোনমি গড়ে তুলেছে। প্রযুক্তির আড়ালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকানি থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিত তরুণরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ছে এই মরণনেশায়। আর এই জুয়ার টাকা লেনদেনের প্রধানতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিং খাত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের তথ্য মতে, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র বিদেশে অর্থ পাচার পর্যন্ত করছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, অনলাইন জুয়ায় অর্থ হারানোর ফলে মধ্য ও নি¤œবিত্ত পরিবারের সঞ্চয় কমেছে প্রায় চার দশমিক পাঁচ শতাংশ। এটি অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য ক্রয়ের সক্ষমতা কমিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জুয়ার টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে লেনদেন হওয়ায় সরকার প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভ্যাট ও ট্যাক্স হারাচ্ছে। এ ছাড়া ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হচ্ছে, যা দেশের ডলার রিজার্ভের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করছে। এমএফএস-এর এই অপব্যবহারের কারণে দেশের মূল জিডিপির সমান্তরালে অনানুষ্ঠানিক বা ‘কালো’ অর্থনীতির আকার চলতি বছরে আরো এক দশমিক দুই শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে ডিজিটাল লেনদেনের প্রায় ৭৮ শতাংশই এখন মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এমএফএস প্ল্যাটফর্মে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩টির বেশি মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা প্রায় ২২ কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে। এমএফএস এজেন্টের সংখ্যা ১৭ লাখেরও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারকারীদের ৫২ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলের এবং প্রায় ৪২ শতাংশ নারী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন, বেতন-ভাতা প্রদান, রেমিট্যান্স, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, ই-কমার্স পেমেন্টসহ প্রায় সব ধরনের আর্থিক সেবা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করেই জুয়ার সিন্ডিকেটগুলো গোপন অর্থনীতির বিস্তার ঘটাচ্ছে। অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও প্রকৃত অঙ্ক আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যেভাবে চলছে এই গোপন নেটওয়ার্ক : তদন্তে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বেটিং সাইটগুলো (১এক্সবেট, মেলবেট, বেটবাজ৩৬৫) দেশীয় এজেন্ট বা ‘মাস্টার এজেন্ট’ নিয়োগ করে। এই মাস্টার এজেন্টরা সাধারণ মানুষের এনআইডি ভাড়া করে ভুয়া কেওয়াইসি ফরম পূরণ করে শত শত মোবাইল ব্যাংকিং সিম সচল করে। জুয়াড়িরা এই নম্বগুলোতে ‘ক্যাশ ইন’ বা ‘সেন্ড মানি’ করে ভার্চুয়াল কারেন্সি বা পয়েন্ট কেনে। পরবর্তীতে এই বিপুল পরিমাণ টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি (পলিগন, বিটকয়েন) অথবা অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন জুয়ার চক্রগুলো সাধারণত ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট এবং এজেন্ট ওয়ালেট ব্যবহার করে দ্রুত টাকা স্থানান্তর করে। অনেক ক্ষেত্রে একই অর্থ একাধিক অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে বৈধ লেনদেনের আড়াল তৈরি করা হয়। এরপর সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি, হুন্ডি কিংবা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়।
মোবাইল ব্যাংকিং ও জুয়া লেনদেনের পরিসংখ্যান : পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) তথ্য মতে, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ৪৩ শতাংশের ব্যাংক বা মোবাইল মানি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। দেশে ডিজিটাল লেনদেনের ৭৮ শতাংশই হয় মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে। এ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা লেনদেন করা হয়।
জাগো ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশে শতাধিক অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ জুয়া খেলেন। ২০২০ সালের চেয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজার বেড়েছে চার দশমিক সাত শতাংশ। কিন্তু অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপ বন্ধে কার্যকর আইনি উদ্যোগ না থাকায় আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছেন লাখ লাখ তরুণ-তরুণী।
সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির সাম্প্রতিক যৌথ তদন্ত রিপোর্ট ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) পর্যন্ত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার লেনদেনে দেখা যায়, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন ও পাচার হয়েছে। প্রতি মাসে এমএফএস (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জুয়াবাবদ গড়ে দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি অবৈধ ট্রানজ্যাকশন সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনলাইন জুয়ার সাথে যুক্ত। যার মধ্যে প্রায় ২০ লাখ নিয়মিত সক্রিয় জুয়াড়ি। সারা দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত এক হাজার ৫০০ এর বেশি নিবন্ধিত এজেন্ট এবং ডিএসও সরাসরি জুয়াড়িদের কাছে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে নিজেদের নম্বর ভাড়া দিয়ে এই চক্র পরিচালনা করছে।
আইনি ব্যবস্থা ও কঠোরতা : সাইবার নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, কোনো ডিজিটাল মাধ্যম বা ওয়েবসাইটে অনুমতি ছাড়া লটারি, জুয়া বা বেটিং খেলা এবং এর প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অপরাধে অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে। তাছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার টাকা স্থানান্তর বা বিদেশে পাচার করা মানিলন্ডারিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। এই অপরাধে জড়িত ব্যক্তি বা এজেন্টের চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং পাচারকৃত অর্থের দ্বিগুণ বা ১০ লাখ টাকা (যা অধিক) জরিমানার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি জড়িত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
এদিকে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় সরকারের কঠোর নির্দেশনায় চলতি বছরে এ পর্যন্ত জুয়ায় জড়িত থাকার অপরাধে এক হাজারটিরও বেশি এমএফএস এজেন্ট ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের শেষ দিকে সব এমএফএস অপারেটরকে অনলাইন জুয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট লেনদেন বন্ধে জরুরি নির্দেশনা দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে তালিকা প্রস্তুত করতে হবে এবং বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও উদ্বেগ : অনলাইন জুয়া এখন এক সংক্রামক ব্যাধি। পর্যবেক্ষকরা জানান, সহজ আয়ের লোভে পড়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ নিঃস্ব হচ্ছে, যার ফলে পারিবারিক সহিংসতা এবং চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শুধু আইনি কঠোরতা নয়, পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সচেতনতা তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি। এই সমান্তরাল অর্থনীতি ও যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে কেবল মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য দরকার প্রতিটি এমএফএস ট্রানজ্যাকশনের রিয়েল-টাইম মনিটরিং, জুয়ার অ্যাপগুলোর আইপি ব্লক করা এবং জুয়ার প্রলোভন দেখানো অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ডিজিটাল সেন্সরশিপ আরোপ করা।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অনলাইন জুয়ার অ্যাপ ও ওয়েবসাইটগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিগ্রাম চ্যানেল ও ইউটিউব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভিপিএন ব্যবহার করে নিষিদ্ধ সাইটে প্রবেশ করা হচ্ছে, ফলে নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ছে। অনলাইন জুয়া বন্ধে শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না; প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, শক্তিশালী সাইবার গোয়েন্দা ইউনিট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহজলভ্যতাকে জুয়াড়িরা হাতিয়ার বানিয়েছে। জুয়ার এই গোপন অর্থনীতি দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলকে পাশ কাটিয়ে চলায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ও রেমিট্যান্স হারাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ব্যাংক ও এমএফএস অপারেটরদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার করে এই সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম নাজমুল হোসেন বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, কিন্তু দুর্বল নজরদারি এটিকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের বড় মাধ্যমেও পরিণত করছে। অনলাইন জুয়া শুধু অর্থ পাচার নয়, তরুণ সমাজকে আসক্তির দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।



