পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতে ভারতের আন্তরিকতা প্রমাণের সময় এসেছে

মমতার বিদায়

বিধান সভার নির্বাচনে মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের হারের কারণে তার ১৫ বছরের টানা শাসনের অবসান হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ লাগোয়া রাজ্যটির ক্ষমতায় আসছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), যে দলটি কেন্দ্রেও ক্ষমতাসীন। তাই এখন বাংলাদেশের সাথে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্যহিস্যা নিশ্চিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তরিকতা প্রমাণের সময় এসেছে।

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার কারণে বাংলাদেশের সাথে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সই করা সম্ভব হচ্ছিল না বলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এতদিন বলে আসছিল। একই কারণে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়েও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে সদ্য সমাপ্ত বিধান সভার নির্বাচনে মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের হারের কারণে তার ১৫ বছরের টানা শাসনের অবসান হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ লাগোয়া রাজ্যটির ক্ষমতায় আসছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), যে দলটি কেন্দ্রেও ক্ষমতাসীন। তাই এখন বাংলাদেশের সাথে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্যহিস্যা নিশ্চিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তরিকতা প্রমাণের সময় এসেছে।

এ দিকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বাংলাভাষী মানুষদের বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার ব্যাপারে খুব উৎসাহী। সম্প্রতি এ বিষয়ে তার করা মন্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাধেকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিজেপির উত্থানের কারণে এখন আসামের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এমনই অভিমত ব্যক্ত করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম শহিদুজুমান বলেছেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার পর ভারত হয়তো এখন তিস্তা চুক্তি সইয়ের আশ্বাস দিতে পারে। কিন্তু এ আশ্বাসে বাংলাদেশের বিশ্বাস রাখা উচিত না। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর সীমানা সংলগ্ন এলাকায় ভারত সৈন্য সমাবেশ বাড়িয়েছে, যা আশঙ্কজনক। বিধান সভার নির্বাচনে আসামের মুখ্যমন্ত্রী পুনর্নির্বাচিত হয়েছে। বাংলাভাষীদের বাংলাদেশে পুশইন করার পরিকল্পনা তার রয়েছে। এর আগে হিমান্ত তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি মূলত মমতা ব্যানার্জি, তথা পশ্চিমবঙ্গের ভয়ে। পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিজেপির উত্থানের কারণে এখন আসামের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, মমতা ব্যানার্জি অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদে ফিরতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। তবে তিনি রাজ্য বিজেপির জীবন অস্থির করে তুলতে পারেন এবং হয়তো তিনি সেটাই করবেন। বিধান সভা নির্বাচনে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার ইস্যুটিকে মমতা জোরালোভাবে সামনে আনতে পারেন।

সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, বিধানসভায় পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কিভাবে প্রভাবিত হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ দুই দেশের মধ্যে কিছু অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা চুক্তিতে এতদিন মমতার বিরোধিতাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এখন তারা কতটা আন্তরিক, সেটাই দেখার বিষয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশসংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বোঝাপড়াই মূল বিষয়। সীমান্তে নতুন করে চাপ বা পুশব্যাকের ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলে পুশইনের ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে ঢাকায় সফররত মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের আমলে হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবে ভারত। তিনি জানান, আগামী জুন মাসে চীন বা ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে তার চীন সফরে আলোচনা হবে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, ড. খলিলুর রহমান তিন দিনের সফরে গতকাল বেইজিং গেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একই থাকবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। একই সাথে খুব দ্রুত বাংলাদেশীদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসাসহ অন্যান্য ভিসা স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি সেই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়। আমরা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতিতে চলব।