নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সংলাপে উদ্বেগ

দেশে শিশুশ্রম ও উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার বেড়েছে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দারিদ্র্য, গ্রামীণ বাস্তবতা ও ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক অবস্থার কারণে দেশে শিশুশ্রমের হার বেড়েছে। ২০১৯ সালে শিশুশ্রমের হার ৬.৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইসাথে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে আগামী দিনের শিক্ষা খাত : নতুন চিন্তা, নতুন কাঠামো ও নতুন পদক্ষেপ’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংলাপে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সংলাপের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।

সংলাপে বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী এবং নিউ এজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস-চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম। আলোচক হিসেবে অংশ নেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাঈদ রাশেদ আল-জায়েদ যশ, টিচ ফর বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিয়া ইসলাম মজুমদার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. চৌধুরী মুফাদ আহমদ, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম হেড সমীর রঞ্জন নাথ, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ নাদিয়া রশিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রুবাইয়া মোরশেদ।

মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তি নিশ্চিত হলেও শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। একসময় প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের ভর্তির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছালেও ২০২৪ সালে তা কমে প্রায় ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে যেতে পারছে না বা মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক শিশু স্কুল ছেড়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।

সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, শিক্ষার ব্যয় ও সুযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য রয়েছে। দেশে মোট শিক্ষা ব্যয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি পরিবারকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। ফলে দরিদ্র পরিবারের জন্য শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেয়া হলেও গাইড বই, কোচিং ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর জন্য পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।

গবেষণায় আরো বলা হয়, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা সীমিত। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে নেই। মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার অভাবও শিক্ষার ধারাবাহিকতায় বাধা সৃষ্টি করছে।

প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৩.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে তারা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছে। আধুনিক শ্রমবাজারে শুধু ডিগ্রি নয়, ব্যবহারিক ও মানসিক দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।

তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডিগ্রিকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় রূপান্তর। এ পরিবর্তন না হলে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব কমানো এবং দেশের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা কঠিন হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর তা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা আনার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে এবং একটি ইউনিফর্ম কারিকুলাম চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, যাতে বিভিন্ন ধারার শিক্ষার্থীরা সহজে অন্য ধারায় যেতে পারে।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বিদ্যালয়ে ভর্তিতে বিদ্যমান লটারি ব্যবস্থা গ্রামীণ এলাকার জন্য অপ্রয়োজনীয় উল্লেখ করে এর বাস্তবতা যাচাইয়ের আহ্বান জানান। তিনি লটারি ও মেধার সমন্বয়ে ‘মিশ্র ভর্তি পদ্ধতি’ এবং এলাকাভিত্তিক কোটা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। এ ছাড়া স্কুল ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যানদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানোর প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে।

তিনি আরো বলেন, স্কুল ক্যালেন্ডার নির্ধারণে বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। সব অঞ্চলের জন্য একই ছুটির ক্যালেন্ডার কার্যকর নাও হতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দেশে এখনো স্থায়ী শিক্ষা নীতিমালা গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতার পর একাধিক শিক্ষা কমিশন গঠিত হলেও কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত কম। চীনে জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১.৮ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ১.৫৩ শতাংশ। প্রতি বছরই এ খাতে বরাদ্দ কমছে। শিক্ষা খাতকে এগিয়ে না নিয়ে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়া, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশে কাজ করার মতো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

সভাপতির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস বা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ সম্ভব নয়। আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তিনি শিক্ষা খাতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।