নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো সামরিক হামলা চালালে তার কঠোর জবাব দেয়া হবে। তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হবে। তাদের মতে, কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
এ দিকে উত্তর ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় বুধবার বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষাবাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, আকাশসীমায় ‘শত্রুবিমান’ অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় এ সতর্কতা জারি করা হয়। তবে সম্ভাব্য হুমকি মোকবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। অন্য দিকে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী, ইসরাইল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা বন্ধ রাখবে এবং হিজবুল্লাহও ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালাবে না। তবে এই সমঝোতা চলমান সঙ্ঘাতের পূর্ণ অবসান ঘটাবে না বলে জানিয়েছে লেবাননের দূতাবাস।
ইরানের হামলায় কুয়েত বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত, ফ্লাইট চলাচল বন্ধ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্ঘাত নতুন করে উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত এবং অন্তত ৬৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। হামলায় বিমানবন্দরের একটি টার্মিনাল ভবনে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। খবর আল-জাজিরার।
কুয়েত সরকারের দাবি, হামলার ফলে বিমানবন্দর এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এ দিকে হামলার দায় স্বীকার করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের জবাব হিসেবেই কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসির ভাষ্য, এসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে’। ইরান বলেছে, ইরানে মার্কিন হামলার জন্য ওই দুই দেশের দায় রয়েছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। এ হামলাকে যুদ্ধবিরতি ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে দেশটি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলার ঘটনায় কুয়েত ও বাহরাইনের স্পষ্ট এবং সরাসরি দায় রয়েছে। কারণ তাদের ভূখণ্ড ও সহায়তা নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান বলছে, ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো হামলা হলে তার জবাব দিতে সবধরনের উপায় ব্যবহার করা হবে। এমনকি যেকোনো হামলার উৎসকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
এর আগে এক বিবৃতিতে কুয়েতের প্রতিরক্ষাবাহিনী বলেছে, মঙ্গলবার ভোরের দিকে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে এই হামলায় ব্যবহৃত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষ্যে আঘাত হানার আগেই সেসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে কোনো স্থাপনায় শত্রুতাপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেনি বলে কুয়েতের প্রতিরক্ষাবাহিনী নিশ্চিত করেছে। মাঝরাতে যে শব্দ শোনা গিয়েছিল, সেটি ছিল শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন ধ্বংসের আওয়াজ। তবে কুয়েতের প্রতিরক্ষাবাহিনী বিবৃতি দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে পোস্ট করা বার্তায় ওই বিবৃতিকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।
দেশটির এই বাহিনী বলেছে, আমাদের কাছে কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে অন্তত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের সফলভাবে আঘাত হানার প্রমাণ আছে। কুয়েতের পাশাপাশি প্রায় একই সময়ে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দেশটির সেনবাহিনী এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ বলছে, পারস্য উপসাগরীয় ইরানি কেশম দ্বীপের আশপাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর কিছুক্ষণ পরই কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।
অন্য দিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা আত্মরক্ষামূলক অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী একাধিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলেও দাবি করেছে সেন্টকম। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করা। সঙ্ঘাতের এই নতুন মাত্রার মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে। সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরানের সাথে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। তবে এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কথোপকথন কখনো বন্ধ হয়নি; বরং নিয়মিতভাবেই চলছে।’ বিশ্লেষকদের মতে, কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতকে আরো বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। একই সাথে এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করতে সম্মত হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের
ইরান তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করতে সম্মত হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউ ইয়র্ক পোস্টের ‘পড ফোর্স ওয়ান’ পডকাস্টে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানান। গতকাল বুধবার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্ক পোস্ট। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দিতে পারি না এবং তারা ইতোমধ্যে সম্মত হয়েছে যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র রাখবে না। এটিই ছিল সবচেয়ে বড় বিষয়।’
চলমান সঙ্ঘাত ও যুদ্ধে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে- এমন ধারণাকে উড়িয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইরানের বর্তমান সামরিক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুর দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইরানের কোনো নৌবাহিনী নেই, কোনো বিমানবাহিনী নেই। তাদের হাতে খুব সামান্য কিছু সেনা রয়েছে এবং তাদের কোনো নেতা নেই, কোনো নেতৃত্বও নেই। দেশটির অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের চিত্র তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়ছে। সেখানে এখন ২৫০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি চলছে। একটি দেশের যত ধরনের খারাপ পরিস্থিতি হওয়া সম্ভব, তার সবই এখন তাদের রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর চলমান অর্থনৈতিক ও নৌ অবরোধের বিষয়ে ট্রাম্প জানান, এই অচলাবস্থা খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এই সমস্যার সমাধান বেশ দ্রুতই হয়ে যাবে।’ একই সাথে তিনি দাবি করেন, ইরান সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে বড় সাফল্য অর্জন করছে।
ইরানের নতুন নেতৃত্ব ও চলমান শান্তি আলোচনা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প জানান, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই আলোচনার সাথে সরাসরি যুক্ত আছেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি এই আলোচনায় যুক্ত আছেন, এটা নিশ্চিত। সর্বোচ্চ নেতার প্রভাবের কথা উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অনেকেই বলছে যে, আলোচনার বিষয়ে তিনিই চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছেন। হ্যাঁ, এটা সত্যি। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে এভাবেই চলে আসছে। প্রথমে তার বাবা এবং এখন তিনি। আমি মনে করি, এটি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছেন।’ খামেনির সাথে সম্পর্কের বিষয়ে ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আপাতত আমাদের মধ্যকার বোঝাপড়া বেশ ভালো বলেই মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তার ওপর ভিত্তি করে হয়তো কোনো একপর্যায়ে আমাদের দেখাও হবে।’



