রূপগঞ্জে বকেয়া বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ

শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট

Printed Edition

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বেতনভাতা শ্রমিক ছাঁটাই ও শ্রমিক নির্যাতনের প্রতিবাদে রূপগঞ্জে একটি রফতানিমুখী পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মাঝে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেন। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপে শ্রমিক, পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। উত্তেজিত শ্রমিকরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরোধ করে রেখেছেন। এতে সড়কের উভয় পাশে প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী সাধারণ থেকে পথচারীরা। আটকা পড়ে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সে। শনিবার সকাল ৮টায় উপজেলার মৈইকুলি এলাকার বি ব্রাদার্স কোম্পানি লিমিটেড নামে পোশাক কারখানায় এ শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়।

দুপুর ২টার দিকে রূপগঞ্জ আর্মি ক্যাম্পের একদল সেনাবাহিনী সদস্য ঘটনাস্থলে সে শ্রমিকদের বুঝিয়ে শুনিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেন এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করে দেন। পরে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে মালিকপক্ষের কাছ থেকে আদায় করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে শ্রমিকরা শান্ত হন।

ভুক্তভোগী শ্রমিক ও স্থানীয়রা জানান, মৈকুলি এলাকার বি ব্রাদার্স কোম্পানি লিমিটেড নামে পোশাক কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসের বকেয়া বেতন ভাতার দাবি জানিয়ে আসছেন শ্রমিকরা। মালিকপক্ষ দেশ দিচ্ছি করে বেশ কয়েকদিন ধরে তাদের ঘুরাচ্ছেন। যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের আটকে রেখে নির্যাতন চালাচ্ছেন এবং শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই শ্রমিক এবং মালিকপক্ষ বিরোধ চলে আসছে।

গতকাল সকাল ৭টায় শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে কাজে যোগদান না করে তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে কিছু শ্রমিক কারখানার সামনে অবস্থান নেন। বাকি শ্রমিক কারখানা কর্তৃপক্ষ ভেতরেই আটকে রাখেন। এ নিয়ে কারখানার ভিতরে এবং বাইরের শ্রমিকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে বাইরে থাকা শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। উত্তেজিত শ্রমিকা ঢাকা সিলেট মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে সড়কের উভয় পাশের সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

কারখানার ভেতরে এবং বাইরে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে মালিকপক্ষ ভেতরে থাকা শ্রমিকদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরে শ্রমিকরা বের হয়ে তাদের মধ্যে আরো বেশি অসন্তোষ দেখা দেয় এবং উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

শ্রমিকরা অভিযোগ করে আরো জানান, কারখানার ডাইং এন্ড ফিনিশিং সেকশনের শ্রমিক সজীব মিয়া প্রতিবাদ করায় তাকে বেধড়ক পিটায় মালিকপক্ষের লোকজন। এ ছাড়া যারা প্রতিবাদ করতেন তাদেরকে ছাড়াই ছাঁটাই করছে।

কারখানার মালিক নুরুল হক মোহন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদ সদস্য হওয়ার সুবাদে তখন শ্রমিকদের নানাভাবে নির্যাতন করেছে। বর্তমানে কারখানার জিএম শরীফ আহমেদ ও এজিএম নুর ইসলাম হাদী শ্রমিকদের নির্যাতন ও গালমন্দ করে নানা ধরনের হয়রানি করছেন। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে এ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

এ দিকে সড়ক অবরোধের ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা যানবাহন ও যাত্রী সাধারণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়। অনেকে শ্রমিকদের সাথে বাকবিতণ্ডা জড়িয়ে হাতাহাতি ও মারামারি ঘটনা ঘটে।

বেলা সাড়ে দশটার দিকে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। শ্রমিক এবং মালিকপক্ষকে সমঝোতা চেষ্টায় বেশ কয়েকবার বসেন।

যানবাহন চালক ও যাত্রীরা জানান, রমজানে রোজা রেখে শ্রমিকদের অবরোধের কারণে সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রী সাধারণ। এভাবে তো চলতে পারে না। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ভাতা থাকলে মালিকপক্ষের সাথে বসে সমঝোতা করে তা সমাধান করবে সড়কে কেন। এসব ব্যাপারে সমাধান হওয়া দরকার।

বেলা পৌনে একটার দিকে রূপগঞ্জ থানার ওসি সবজেল হোসেনসহ একদল পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে না পেরে লাঠিচার্জ করে। এক পর্যায়ে শ্রমিক পুলিশ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। উত্তেজিত শ্রমিকরা সড়কে আটকা পড়া বাস ট্রাক সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর করে। এ ছাড়া গার্মেন্টস ভাঙচুর করে। কারখানার ভেতরে পুলিশ প্রশাসন ও মালিকপক্ষ অবস্থান করছে সেখান থেকেই শ্রমিক এবং তাদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় টিয়ারশেল এবং ইটপাটকেলে শ্রমিক, পুলিশ, পথচারী, সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন হয়েছেন। সড়কে আটকা পড়া যানবাহন চালক যাত্রী সাধারণ ও পথচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পথচারী ও যাত্রীরা সংঘর্ষ দেখে ছোটাছুটি করতে গিয়ে অনেকেই পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, নারায়ণগঞ্জ-১ রূপগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু ও রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম।

নারায়ণগঞ্জ-১ রূপগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের দাবিদাওয়া যে বিষয়টি রয়েছে তা মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে আদায় করে দেয়ার ব্যবস্থা করব আমি কথা দিলাম। এজন্য আমাকে একটু সময় দিতে হবে। শ্রমিকরা আছে বলেই আমাদের এ শিল্পকলা কারখানা বেঁচে আছে। তাই শ্রমিক বেঁচে থাকলেই শিল্প-কলকারখানা বেঁচে থাকবে।