২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল প্রায় সতেরো বছর বিচারকের দায়িত্ব পালনের পর মো: রেজাউল হাসান নিঃশব্দে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে পদত্যাগ করেন। তার এ প্রস্থান কোনো আকস্মিক জনরোষে কিংবা এজলাসে তৈরি হওয়া কোনো নাটকীয় পরিস্থিতির ফল ছিল না। বরং এটি ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে (যা বিচারকদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের একটি সাংবিধানিক সংস্থা) তার বিরুদ্ধে দাখিল করা একটি বিস্তারিত অভিযোগের প্রতিক্রিয়া। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণ, বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগ এনে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
ওরিয়ন গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি কোম্পানি বিরোধে নিজের স্ত্রী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন- এমন দাবি তুলে এক বিচারপ্রার্থীর স্বামী অভিযোগটি দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, ওই বিচারক আদালত চলাকালীন অপেশাদার আচরণ করেছেন; তিনি এমন সব যুক্তি নথিবদ্ধ করেছেন, যা আদতে কখনো আদালতে পেশ করা হয়নি। সেই সাথে বিবাদি পক্ষকে শুনানির কোনো সুযোগ না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নারীর কোম্পানি শেয়ারসংক্রান্ত বিষয়ে একতরফা আদেশ দিয়েছেন।
বছরের পর বছর ধরে হাইকোর্ট পাড়ায় আইনজীবীদের মুখে মুখে ওই বিচারকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছিল। দীর্ঘদিনের সেই গুঞ্জন এই একটি অভিযোগের হাত ধরে দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক শৃঙ্খলা পর্ষদের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ায়, যা কার্যত তাকে পদত্যাগে বাধ্য করার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
২০২৫ সালের ৯ জুলাই উল্লিখিত বিচারপ্রার্থী নারীর স্বামী মো: মুজিবুল হক অভিযোগটি দায়ের করেন। তিনি সংবিধানের ৯৬(৪)(খ) ও ৯৬(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ ছাড়া ওই বিচারককে পদ থেকে অপসারণের আবেদন জানান।
ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করিম এবং তার পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জেরে আলোচিত মামলার বিচারক মো: রেজাউল হাসানের আদালতে দু’টি মামলা চলেছিল; সেই মামলা দু’টির বিচাপ্রক্রিয়া ঘিরে এ গুরুতর অভিযোগটি দায়ের করা হয়।
মো: মুজিবুল হকের দাবি অনুযায়ী, ওই বিচারক অভিযোগকারীর স্ত্রীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার বিচাকার্যক্রমে বারবার ওরিয়ন গ্রুপের অনুকূলে অবস্থান নিয়েছিলেন। অভিযোগগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুতর। তবে সেগুলো যে বিষয়টি অস্বাভাবিক শক্তিতে বলীয়ান করেছিল, তা হলো- এসব ঘটনার মধ্য থেকে একটি ঘটনা বছর তিনেক আগে আপিল বিভাগের নজরে এসেছিল। প্রথম অভিযোগটি ছিল অভিযোগকারীর স্ত্রী জেবা হকের দায়ের করা একটি মামলাসংক্রান্ত। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ ওই বিচারক মো: রেজাউল হাসানের এজলাসে মামলাটি ‘আংশিকশ্রুত’ হিসেবে তালিকায় ছিল। অভিযোগকারীর দাবি, সে সময় সিনিয়র কাউন্সিল আজমালুল হোসেন কিউসি ব্যক্তিগত অসুবিধায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। তার পক্ষে একজন জুনিয়র আইনজীবী সময় প্রার্থনা করলেও আদালত তা নাকচ করে দেন। এরপর অভিযোগকারীর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলাটির রায় ঘোষণা করা হয়।
বিষয়টি যদি সেখানে শেষ হতো, তবে একে স্রেফ একজন সংক্ষুব্ধ বিচারপ্রার্থীর অসন্তোষ হিসেবে গণ্য করা যেত। কিন্তু অভিযোগটিতে আরো উদ্বেগের একটি তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, আজমালুল হোসেন কিউসির আদালতে উপস্থিত না থাকা এবং কোনো বক্তব্য পেশ না করা সত্ত্বেও, রায়ের কপিতে তার দীর্ঘ আইনি যুক্তিগুলো এমনভাবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যেন তিনি নিজে সেগুলো উপস্থাপন করেছেন। দায়েরকৃত অভিযোগে রায়ের বিশাল একটি অংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় যে বিপুল পরিমাণ আইনি সওয়াল-জবাব ওই আইনজীবীর মুখনিঃসৃত বলে নথিবদ্ধ করা হয়েছে; অথচ তিনি সেদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
বেশির ভাগ আইনি ব্যবস্থায়, একজন বিচারকের জন্য এর চেয়ে গুরুতর অভিযোগ খুব কম হতে পারে যে, তিনি প্রকাশ্য আদালতের কার্যবিবরণী জালিয়াতি করেছেন। বিচারকরা ভুল করতে পারেন, তারা আইনি যুক্তির ভুল ব্যাখ্যা দিতে পারেন, এমনকি তারা অযৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন। কিন্তু একজন বিচারক যদি জেনেশুনে এমন সব যুক্তি নথিবদ্ধ করেন, যা আদালতে কখনো উপস্থাপন করা হয়নি, তবে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
দায়েরকৃত অভিযোগে আরো একটি বড় তথ্য সামনে আনা হয়েছে। অভিযোগকারীর স্ত্রীর করা এক আপিল মামলার শুনানিতে আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি স্বয়ং আপিল বিভাগকে জানান, সংশ্লিষ্ট দিনে তিনি মো: রেজাউল হাসানের আদালতে উপস্থিত ছিলেন না; অর্থাৎ বিচারক তার রায়ে যে দীর্ঘ যুক্তিতর্ক নথিবদ্ধ করেছেন, তা তিনি কখনো প্রদান করেননি। আরো গুরুতর বিষয় হলো, অন্য পক্ষ অর্থাৎ ওরিয়ন গ্রুপের নিয়োজিত আইনজীবীও আপিল বিভাগের জিজ্ঞাসাবাদে ওই বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করে নেন। ফলে আপিল বিভাগ বিচারক মো: রেজাউল হাসানের দেয়া পুরো রায়টি বাতিল করে দেন। সেই সাথে বিষয়টির আবার শুনানির নির্দেশ দেন।
দ্বিতীয় প্রধান অভিযোগটি ছিল এই যে, মামলাটির বিচারক মো: রেজাউল হাসান অভিযোগকারীর স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি কোম্পানির শেয়ার বাতিল করেছেন অথবা বাতিল করতে সহায়তা করেছেন; অথচ তিনি ওই নারীকে মামলার পক্ষভুক্ত করেননি কিংবা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগও দেননি। ১৩ কোটি টাকার শেয়ার আদতে মূল্যহীন হয়ে পড়ে যখন বিচারক ওরিয়ন গ্রুপের একপক্ষীয় হলফনামা আমলে নিয়ে রায় দেন। দায়ের করা অভিযোগে সরাসরি বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিচারক ওরিয়ন গ্রুপের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব দেখিয়ে বিচারিক ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। অথচ যার অধিকার এখানে খর্ব করা হয়েছে, তার আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
অভিযোগটিতে আর্থিক দুর্নীতির প্রসঙ্গও উত্থাপন করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয় যে, ওই বিচারকের স্ত্রী ও ছেলের কাছে তাদের আয়ের জ্ঞাত উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল সম্পদ আছে। এই সম্পদের মধ্যে ‘সাফকো নেভ লিমিটেড’ নামের একটি শিপিং কোম্পানিতে বড় অঙ্কের শেয়ার এবং একটি বাণিজ্যিক জাহাজের মালিকানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগটিতে বিচারক কর্তৃক তার ছেলেকে উপহার দেয়া একটি ‘বিএমডব্লিউ এক্স-৪’ গাড়ির প্রসঙ্গও টানা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, আয়কর নথিতে গাড়িটির যে মূল্য দেখানো হয়েছে, তা এর প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম বা অস্বাভাবিকভাবে কম করে দেখানো হয়েছে।
প্রমাণগত দিক থেকে আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত এসব অভিযোগ সম্ভবত পুরো অভিযোগপত্রের সবচেয়ে দুর্বল অংশ ছিল। এর বড় অংশ সরাসরি ঘুষের প্রমাণের পরিবর্তে অনুমান ও সন্দেহের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবু রাজনৈতিকভাবে এসব অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এগুলো বাংলাদেশের একটি বহুল পরিচিত জনধারণা আরো জোরালো করে, যে দেশে দুর্নীতি প্রায়ই পরিবারের সদস্য, ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানি ও অঘোষিত সম্পদের আড়ালে গোপন রাখা হয়।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, আলোচিত মামলার বিচারক মো: রেজাউল হাসানের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা তখন হাইকোর্টের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব কথা পুরোপুরি সত্য নাকি কিছুটা রটনা, তা ভিন্ন বিষয়; কিন্তু এমন পরিস্থিতি বিচার বিভাগের জন্য যে এক গভীর সঙ্কটের বার্তা দিচ্ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশে বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সচরাচর আকস্মিকভাবে সামনে আসে না; বরং কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কয়েক বছর আগে থেকে আইনজীবীদের অন্দরে গুজব, কানকথা কিংবা ফিসফিসানি হিসেবে ডালপালা মেলতে থাকে।
পার্থক্যটা তৈরি হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতন-পরবর্তী রাজনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে। আগের রাজনৈতিক আমলে বিচারকদের বিরুদ্ধে ওঠা অসংখ্য অভিযোগ সুকৌশলে সমাহিত বা চাপা দেয়া হয়েছিল। চব্বিশ-পরবর্তী প্রেক্ষাপট সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছিল। রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা সুরক্ষা যখন দুর্বল হয়ে পড়ল, পুরনো ক্ষোভগুলো বিস্ময়কর দ্রুততায় আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কর্মরত বিচারকের বিরুদ্ধে সরাসরি নালিশ করার কথা যারা আগে কল্পনাও করতে পারতেন না, সেই আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে সাহসী হয়ে উঠলেন। আলোচিত মামলার বিচারক মো: রেজাউল হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নালিশটি ছিল মূলত বদলে যাওয়া সময়ের এক প্রতিফলন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অভিযোগের তদন্ত মোকাবেলা করা এবং দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে তিনি সম্মানের সাথে পদ থেকে সরে দাঁড়ানো উত্তম মনে করেন।
বিচারকদের শৃঙ্খলা-রক্ষায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আমাদের সর্বোত্তম আইনি কাঠামো। তবে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন বিচারকের পদত্যাগ করার সুযোগ পাওয়া এ ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার দিক উন্মোচিত করে। এখন এটি প্রতীয়মান হচ্ছে, যখন কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তখন তিনি পদত্যাগের মাধ্যমে তার কৃতকর্মের দায়বদ্ধতা বা তদন্ত এড়ানোর একটি সহজ পথ পেয়ে যান। এর অর্থ হলো, বিচারকদের গুরুতর অসদাচরণের ঘটনাগুলো কদাচিৎ তদন্তের মুখ দেখে। এ ছাড়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্ত শুরুর পর অভিযুক্ত বিচারকের পদত্যাগের সুযোগ থাকায় এ শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়ার ভয় এখন আর অসদাচরণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। পদত্যাগ যেন কোনোভাবে অপরাধের দায় থেকে মুক্তির ‘নিষ্কৃতিপত্র’ না হয়ে দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারকের আসন ছাড়লেই যদি অভিযোগের সমাধি ঘটে, তবে বিচারপ্রার্থী মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সংবিধানের রক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইনের এমন সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে পদত্যাগ কেবল চেয়ার ত্যাগ হবে, তদন্ত থেকে পলায়ন নয়।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



