বহুমুখী সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তৈরী পোশাক খাত। এক দিকে কমছে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ। অন্য দিকে লাগামহীন বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কট ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ। গতকাল সহযোগী একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বহুমুখী সঙ্কটে বিগত তিন বছরে অন্তত ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রফতানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ জোগান দেয়া এই খাতের এমন নাজুক অবস্থা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনি সঙ্কেত।
গত ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ; কিন্তু এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বহন করা ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে টিকে থাকা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ভারত, ভিয়েতনাম ও চীন যেসব দেশে রফতানি করে, তাদেরকে কর-সুবিধা ও প্রণোদনা দিচ্ছে; কিন্তু আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের পোহাতে হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায়ও হাবুডুবু খেতে হয় তাদের।
সময়ের সাথে পাল্লা দিতে না পারলে পোশাকশিল্পের ব্যবসায় টিকিয়ে রাখা কঠিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে ক্রেতারা ডিসকাউন্ট দাবি করে। কখনো অর্ডারও বাতিল করে দেয়। পোশাকশিল্পে প্রতিনিয়ত নতুন ডিজাইন, নতুন কাপড়, নতুন রঙ ও ভিন্নধর্মী এক্সেসরিজ ব্যবহার করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য চেনার জন্য হারমোনাইজড সিস্টেম কোড ব্যবহার করতে হয়। আমাদের দেশে এই কোড সংযোজন এবং কাস্টমস যাচাইয়ে আছে জটিলতা। এতে আকাশপথের ব্যয়বহুল শিপমেন্ট ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এতে লোকসানের পাল্লা ভারী করছে। এ ছাড়া নানা অজুহাতে উচ্চহারে কর আদায়ের অভিযোগও আছে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে কিছু প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। বিশ্ববাজারে কোনো কিছুর দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা যেন চাপে না পড়ে, এসব বিষয় সরকারকে বিবেচনায় রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে তাদের প্রস্তাবে। নীতিসহায়তা দেয়ার কথা বলছেন তারা।
কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে রফতানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দিন শেষ। এখন অন্য দিকগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে, কর ও ভ্যাট কাঠামো সহজ করা জরুরি। নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ব্যবসায়ীদের তারল্য সঙ্কট মেটানো যায় কি না ভেবে দেখতে হবে। কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রফতানিতে আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করা জরুরি। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধে নমনীয়তা ছোট কারখানাগুলোর জন্য অক্সিজেন হিসেবে কাজ করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, তৈরী পোশাক খাত কেবল বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয়। এটি লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ঠিকানা। এই খাত মুখ থুবড়ে পড়লে সমাজ অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়লে সেই জায়গা দখল করে নেবে অন্য কোনো দেশ। তাই পোশাক খাতের ক্ষত সারাতে এখনই কার্যকর ও সাহসী পদক্ষেপ নেয়া হোক।



