আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

শিকাগোর সংগ্রাম, ট্রেড ইউনিয়ন ও মহানবীর আদর্শ

ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে একটি কল্যাণময় ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন বিরামহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৫ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইনের আওতায় ১৯৬৮ সালের ২৩ মে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠা। পরে ১৯৬৯ সালে শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশ ও ১৯৭৭ সালের শিল্প-সম্পর্ক বিধিমালার বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ সরকারের লেবার ডাইরেক্টরেটে ১৯৮০ সালের ১৫ মে দ্বিতীয়বার নিবন্ধন পায়। বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ফেডারেশনটি আজ ৪৯ বছরের পুরনো ইসলামী পতাকাবাহী একমাত্র শ্রমিক সংগঠন। জন্মলগ্ন থেকে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের মাধ্যমে দক্ষতা, আন্তরিকতা, সততা ও যোগ্যতায় পেশা-শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে

মিয়া গোলাম পরওয়ার
শেষ কিস্তি

শ্রমিকের বহুবিধ মৌলিক অধিকার আছে। যেমন- চাকরি, নিয়োগ ও শর্তাবলি, শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান, মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক, কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, চাকরি ও জীবনের নিরাপত্তা-নিশ্চয়তা, সাধ্যের অতিরিক্ত শ্রম না দেয়া, পেশাগত প্রশিক্ষণ, কাজ শেষে মজুরি, মুনাফায় শ্রমিকের অধিকার, শ্রমিকের কষ্ট লাঘব, নারী-পুরুষ শ্রমিকের সমতা বিধান চাকরির সব ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, পোষ্যদের ভরণ-পোষণ, চাকরিতে পদোন্নতি, বেতন পরিশোধের নীতিমালা, ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ, ছুটি ও বিশ্রামের বিধান, জুলুমের প্রতিবাদ, সংগঠন করার অধিকার, যৌথ দরকষাকষির বিধান, অবসরকালীন ভাতা, সন্তানদের শিক্ষার অধিকার, নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসার অধিকার, অমুসলিম শ্রমিকের অধিকার, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও প্রসূতিকালীন ছুটি ও সুবিধা, শিশুশ্রম, শিশু যত্নাগার, রাষ্ট্রীয়করণ ও বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতি, অপরাধ ও দণ্ডবিধি, শ্রমবিরোধ নিষ্পত্তি, দুর্ঘটনা-কবলিত শ্রমিকের সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ এবং ওয়েলফেয়ার ইত্যাদি।

এসব অধিকার ও আইনের ইনসাফ-ভিত্তিক কোনো বাস্তবায়ন মানবরচিত মতবাদ বা শ্রমনীতির মাধ্যমে কি সম্ভব? পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের ব্যর্থতার পটভূমিতে নিপীড়িত, বঞ্চিত, অনাহারি ও মজলুম শ্রমজীবী মানুষের আজ ফরিয়াদ- তারা প্রকৃত মুক্তি চান। প্রতারক ও স্বার্থান্বেষী নেতৃত্বের বেড়াজাল ছিন্ন করে তারা বেরিয়ে আসতে উদগ্রীব। নীতি-নৈতিকতার মানে যারা উন্নীত এমন নেতৃত্বের আজ শ্রমিক ময়দানে অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। শ্রমিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোনো জোড়াতালি বা মানবরচিত বিধানের মাধ্যমে যে সম্ভব নয়, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। দেশ পরিচালনাকারীরা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি-মেধা, ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও পাশ্চাত্য সভ্যতার শিক্ষা যথেষ্ট মনে করেন। কিন্তু তারা মহান আল্লাহর দেয়া বিধানের কোনো প্রয়োজন মনে করেন না। অথচ গোটা প্রাকৃতিক জগত তার বিধান মেনে চলছে বিধায় সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সে জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআন মজিদে মানবজাতির সুখ-শান্তির যে বিধান দিয়েছেন তা পালন করা ছাড়া জীবনের কোনো সমস্যার স্থায়ী ও সন্তোষজনক সমাধান হতে পারে না।

মানবতার দরদি বন্ধু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির জন্য এক ঐতিহাসিক ভাষণে যে অনুপম শ্রমনীতি দিয়ে গেছেন তার কিয়দাংশ নিম্নরূপ :

‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, গোলামদের সাথে ভালো আচরণ করবে এবং তাদের কোনো কষ্ট দেবে না। তোমরা কি জানো না যে, তাদের একটি অন্তর আছে, যা কষ্ট পেলে ব্যথা পায় এবং আরাম পেলে আনন্দিত হয়। তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা তাদের হীন মনে করো এবং তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করো না! এটি কি জাহিলিয়াতের যুগের মানসিকতা নয়। অবশ্যই এটি জুলুম এবং বে-ইনসাফি।

ইসলামী আদর্শের কাছে মনিব-গোলাম, বড়-ছোট, আমির-ফকির সবাই সমান। মানুষের মধ্যে শুধু তাকওয়া এবং সৎকাজের মাধ্যমে পার্থক্য হতে পারে। এটি যখন প্রকৃত ব্যাপার, তবে তোমরা কেন তোমাদের অধীনস্থদের হীন মনে করো। আমি আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তোমাদের বলছি, তোমরা তাদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে, তোমরা তাদের থেকে এতটুকু কাজ নেবে যা তাদের জন্য সহজ। তোমরা তাদের তাই খেতে দেবে, যা তোমরা নিজেরা খাও। তোমরা তাদের তাই পরতে দেবে, যা তোমরা নিজেরা পরিধান করো। তোমরা তাদের সাথে সেরকম আচরণ করবে, যে ধরনের আচরণ তোমরা তোমাদের প্রিয়জনদের সাথে করে থাকো। তোমরা তাদের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা তোমরা নিজেদের জন্য পছন্দ করে থাকো। যখন তোমরা তাদের সফরে নিয়ে যাও, তাদের আরাম-আয়েশের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। যদি তোমাদের কাছে কোনো বাহন থাকে, কিছু সময় তোমরা আরোহণ করো আবার কিছু সময় তাদের বাহনে আরাম করার সুযোগ করে দাও।

আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, যখন কোনো খাদেম তোমাদের কাছে খানা নিয়ে আসে, তোমরা তখন তাদের তোমাদের সাথে বসিয়ে খাওয়াবে। যদি খাবার পর্যাপ্ত না হয়, অন্তত কিছু না কিছু তাকে দিয়ে দাও। গোলামেরা যদি কোনো অন্যায় করে তা হলে প্রতিদিন ৭০ বার তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। এ জন্য যে, তোমরা যার গোলাম তিনি হাজারও অন্যায় ক্ষমা করে দিচ্ছেন। স্মরণ করো- যে ব্যক্তি অধীনস্থদের উপরে এমন অভিযোগ উত্থাপন করবে, মূলত সে তা করেনি। তা হলে কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তিকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। তোমাদের আমি বারবার বলছি, অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তাদের এমন কঠিন কাজ দিও না যা তাদের শক্তির চেয়েও বেশি। (খুৎবাতে নবী করিম সা:) মেহনতি মানুষের জন্য প্রিয় নবীর এই ভাষণে ইসলামী শ্রমনীতির মূলনীতি বিধৃত হয়েছে সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন- ‘মানব জীবনের যেকোনো সমস্যার সমাধানে সঠিক পথ নির্দেশনা কী? আল কুরআনের ঘোষণা- তোমাদের মধ্যে যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় তা আল্লাহ অর্থাৎ তাঁর রাসূল সা:-এর নির্দেশ মোতাবেক মীমাংসা করে নাও’ (সূরা নিসা-৫৯)’

যারা ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ইসলামী আন্দোলন করছেন এবং ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন, তাদের এ কথা মনে রাখতে হবে- ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং ইসলামী শ্রমনীতির সংগ্রাম এক ও অভিন্ন। ইসলামী শ্রমনীতি গোটা ইসলামী ব্যবস্থার একটি অংশ। ইসলামের অংশবিশেষ পৃথকভাবে কোথাও পুরোপুরি কায়েম করা যায় না, ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত। অর্থাৎ- ইসলামী পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা কায়েম হলে কেবল ইসলামী শ্রমনীতিসহ সব দিক ও বিভাগ চালু হওয়া সম্ভব। তাই ইসলামী শ্রমনীতির সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রচেষ্টা জোরদার করার পাশাপাশি ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামও একই সাথে এগিয়ে নিতে হবে।

শিকাগোর সংগ্রাম ১৮৮৬ সাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত ১৩১ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আমরা কী পেয়েছি? আমরা ট্রেড ইউনিয়ন পেয়েছি। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইন ও নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। অগণিত শ্রমজীবী মানুষ তাদের জীবনও বিলিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু বিনিময়ে শ্রমজীবী মানুষের কতটা ভাগ্যের বদল হয়েছে? তাদের জীবনযন্ত্রণা কি থেমেছে? আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অন্নহীনের কান্না, বস্ত্রহীনের মর্মব্যথা আর নিরাশ্রয়ের আকুতি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত।

শ্রমজীবী মেহনতি জনতার তাই ইসলামের শাশ্বত, কালজয়ী ও অনুপম মুক্তির কল্যাণময় পথে ফিরে আসা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। মানুষের উপর মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে কেবল মহান সৃষ্টিকর্তা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কবুল করে নেয়ার মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন
ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে একটি কল্যাণময় ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন বিরামহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৫ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইনের আওতায় ১৯৬৮ সালের ২৩ মে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠা। পরে ১৯৬৯ সালে শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশ ও ১৯৭৭ সালের শিল্প-সম্পর্ক বিধিমালার বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ সরকারের লেবার ডাইরেক্টরেটে ১৯৮০ সালের ১৫ মে দ্বিতীয়বার নিবন্ধন পায়। বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ফেডারেশনটি আজ ৪৯ বছরের পুরনো ইসলামী পতাকাবাহী একমাত্র শ্রমিক সংগঠন। জন্মলগ্ন থেকে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের মাধ্যমে দক্ষতা, আন্তরিকতা, সততা ও যোগ্যতায় পেশা-শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শত শত বেসিক ইউনিয়ন ও পেশাভিত্তিক ফেডারেশন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ফেডারেশনটি ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) অনুসমর্থিত কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ দ্বারা সমর্থিত। ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক কনফেডারেশন অব লেবারের (আইআইসিএল) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং আইআইসিএলের নির্বাচিত সহ-সভাপতি।

পরিশেষে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস পয়লা মে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির চেতনায় উদ্ভাসিত হোক। শিকাগোর সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিকামী মজলুম মনবতার জন্য বিশ্বনবী সা:-এর মহান আদর্শই হয়ে উঠুক বিশ্বশান্তির শেষ ঠিকানা।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য, সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।